About Md. Shariful Islam

বাংলার নারী জাগরণ ও নারীর অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আজকের দিনে, ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩২ সালে একই দিনে মৃত্যুবরণ করেন।

বাঙালি নারীর বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান নারীর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজীবন রোকেয়া ছিলেন অক্লান্ত। অন্দরমহল আর রসুইঘরের বাইরেও নারীর অবদান রাখার সুযোগ ও যোগ্যতা রয়েছে, বিদূষী রোকেয়া তাঁর সমস্ত কর্ম-প্রচেষ্টা দিয়ে তাই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।

আগলবদ্ধ নারী সমাজের প্রতিনিধি রোকেয়া আবদ্ধ মুসলিম সমাজের অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে আসেন অসামান্য সাহস, প্রবল আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। রোকেয়াই প্রথমবারের মতো বাঙালি মুসলিম সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অধিকারের দাবি তুলে ধরেন এবং নারী স্বাধীনতার পক্ষে নিজের মতবাদ প্রচার করেন।

নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং আলোর দিশারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতি রইল পাঞ্জেরীর গভীর শ্রদ্ধা।

কবি নজরুল সরকারি কলেজঃ- হাজী মুহম্মদ মোহসীন ফান্ডের আর্থিক সহায়তায় ১৮৭৪ সালে ঢাকায় কলকাতা মাদ্রাসার আদলে মোহসীনিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে এটি ঢাকা মাদ্রাসা নামে প্রসিদ্ধ হয়। এটি ছিল পূর্ববাংলার মুসলমানদের জন্য প্রথম সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ মাদ্রাসার প্রথম সুপারিনটেন্ডেন্ট ছিলেন পন্ডিত ও ভাষাবিদ বাহারুল উলুম মাওলানা ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী। ১৯১৫ সাল পর্যন্ত হাজী মুহম্মদ মোহসীন ফান্ড থেকে এই মাদ্রাসার ব্যয় নির্বাহ করা হয়। উক্ত সালে এটি উচ্চ মাদ্রাসায় রূপান্তরিত হয়। ১৯১৬ সালে মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগটি পৃথক হয়ে ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাইস্কুল নাম ধারণ করে। ১৯২৩ সালে মাদ্রাসা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং ১৯৬৮ সালে কলেজের নামকরণ হয় সরকারি ইসলামিয়া কলেজ।

আবার নাম পরিবর্তন করে ১৯৭২ সালে কলেজটির নতুন নামকরণ হয় কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং একই বছর এটি ডিগ্রি কলেজে উন্নীত হয়। ১৯৭৮ সালে কলেজে সহশিক্ষার প্রচলন হয়। ১৯৭৯ সালে কলেজটিতে মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখায় স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা চালু হয়। ১৯৮৫ সালে কলেজে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে প্রথম স্নাতক সম্মান কোর্স খোলা হয়। ১৯৯৩ সালে কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ১ম পর্ব মাস্টার্স কোর্স চালু হয়। কলেজটিতে ১৯৮২ সালে বিএনসিসি কন্টিনজেন্ট এবং রোভার স্কাউট ব্যবস্থা চালু হয়।

২০০৪ সালে এই কলেজে বাংলা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা ও ভূগোলসহ মোট ১২টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়। ১৯৯৭ সালে হিসাববিজ্ঞানে ১ম পর্ব মাস্টার্স এবং হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা ও ইংরেজি বিষয়ে অনার্স কোর্স খোলা হয়। ২০০৬ সালে বাংলায় ১ম পর্ব স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয়। বর্তমানে কলেজে মোট ১৭টি বিষয়ে অনার্স, ৫টি বিষয়ে ১ম পর্ব মাস্টার্স এবং ৪টি বিষয়ে শেষ পর্ব মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। কলেজের গ্রন্থাগারটি ৩০,০০০ বইয়ে সমৃদ্ধ।

ফরাশগঞ্জের মোহিনীমোহন দাস লেনে কলেজ ছাত্রাবাসটি অবস্থিত। এটি স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ ছাত্র শামসুল আলমের নামে নামকরণ করা হয় ‘শহীদ শামসুল আলম ছাত্রাবাস’। কলেজের মোট শিক্ষক সংখ্যা ১০৩ জন। ১৮৭৪ সালে ১৬৯ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১৪ হাজার।

প্রফেসর মুহাম্মদ আবদুল হাই, ড. কাজী দীন মুহম্মদ, সাবেক উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি নুরুল ইসলাম, কবি কায়কোবাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন ও সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবুল ফজল, ইতিহাসবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ তাইফুর প্রমুখ কৃতবিদ্য ব্যক্তিত্ব এ কলেজের ছাত্র ছিলেন।
[সৈয়দা সেলিনা বেগম]

আজ ৮ই ডিসেম্বর,
আমাদের 'ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত দিবস'..

১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার মুক্ত হয় আমাদের প্রিয় জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া..বিজয়ের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি জাতীর সে সব সূর্যসন্তানদের যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা..

সবাইকে বিজয়ের শুভেচ্ছা..💜💜

ক্রিশ্চিয়ান মিশন হাসপাতালঃ- ১৮৮৭ সালে ইংল্যান্ডের প্রেসবাইটেরিয়ান চার্চের চিকিৎসা বিষয়ক মিশনারীদের দ্বারা উত্তরবঙ্গে ৫ শয্যার একটি হাসপাতাল হিসেবে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ১৮৯০ সালে এটি রাজশাহী শহরে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৭ সালে একে ১০০ শয্যার চিকিৎসা কেন্দ্রে উন্নীত করা হয়। ১৯৭৪ সালে শিশুদের জন্য ২০ শয্যার একটি ওয়ার্ড সংযোজনের ফলে এর সর্বমোট শয্যা সংখ্যা দাঁড়ায় ১২০ এবং উত্তরণের পরবর্তী সময়ে এ হাসপাতালটি সরকারি অনুমোদন লাভ করে। জনসাধারণকে বহির্বিভাগের সেবা প্রদানের জন্য সপ্তাহের ছয় দিন হাসপাতালটি খোলা থাকে।

১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এ হাসপাতালে একটি চক্ষু ক্লিনিক খোলা হয়েছে। চিকিৎসা প্রদানের জন্য এ হাসপাতালে রয়েছে চারটি ওয়ার্ড; দুটি ওয়ার্ড সাধারণ চিকিৎসা এবং শৈল্যচিকিৎসার, একটি ওয়ার্ড শিশুদের জন্য এবং অন্যটি মায়েদের জন্য।

১৯৭৩ সালে এ হাসপাতালের সেবিকা ইনস্টিটিউট একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি অনুমোদন লাভ করে। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী এর প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালিত হয়। এটি তিন বছরের সাধারণ সেবা প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। শুধু মেয়েদেরকে অতিরিক্ত এক বছর ধাত্রীবিদ্যার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। হাসপাতাল অংশে ১১ জন চিকিৎসকসহ মোট ৬৭ জন কর্মরত রয়েছেন। তাছাড়া প্রায় ২৬ জন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে নিয়োজিত আছেন। নার্সিং ইনস্টিটিউটে একজন অধ্যক্ষসহ সর্বমোট ১৮ জন কর্মচারী রয়েছেন। এ হাসপাতালের প্রধান নির্বাহি একজন মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট।
[স্বপন কুমার হালদার ও নৃপেন ঘোষ]

ক্রিপস মিশন ১৯৪২ সালের ২৩ মার্চ ক্যাবিনেট মন্ত্রী স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতে প্রেরিত একটি মিশন। এ মিশনের মাধ্যমে ভারতকে নতুন কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়। শ্রমিক দলের একজন চরমপন্থি সদস্য ও সে সময়ের হাউস অব কমন্স-এর নেতা ক্রিপস ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একজন প্রবল সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দুটি বিষয়ের ওপর বিবেচনা করে ক্রিপস মিশন প্রণোদিত হয়। প্রথমত, ১৯৪০ সালের অক্টোবরে গান্ধী কর্তৃক সত্যাগ্রহ আন্দোলনের আহবান, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ব্রিটিশদের যুদ্ধ তৎপরতাকে বিঘ্নিত করা এবং ব্রিটিশদের স্বার্থে এর সমাপ্তি টানা। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধে জাপানিদের হাতে সিংগাপুর (১৯৪২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি), রেঙ্গুন (৮ মার্চ) ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের (২৩ মার্চ) পতন সমগ্র ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাঠামোকে হুমকির সামনে ফেলে দিয়েছিল। এরকম সংকটময় পরিস্থিতিতে ব্রিটিশগন উপলব্ধি করেছিল যে, ভারতীয়দের সমর্থন পেতে হলে কিছু কাজ করতে হবে।

ক্রিপস প্রস্তাবে যুদ্ধের পরে যত দ্রুত সম্ভব ব্রিটিশ কমনওয়েলথের ভেতর একটি ভারতীয় ইউনিয়ন গঠনের ইচ্ছার কথা পুনরাবৃত্তি করা হয়, এবং তার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব পেশ করা হয়। ইলেক্টরাল কলেজের ন্যায় কার্য সম্পাদনের জন্য প্রাদেশিক আইন পরিষদ কর্তৃক একটি সংসদীয় সভা নির্বাচিত করতে হবে। এ সংসদই এর পর চুক্তি সম্পাদনের জন্য ব্রিটিশ সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনা করবে। এতে কমনওয়েলথ থেকে ভবিষ্যতে বের হয়ে যাওয়ার অধিকারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লিখিত ছিল। যোগদানের বিষয়টি ভারতীয় রাষ্ট্রসমূহের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ব্রিটিশ সরকারের সাথে দেশীয় রাজন্যবর্গের সম্পাদিত চুক্তি পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়।

পরবর্তী যুদ্ধকালীন সম্পূর্ণ সময়ে এ প্রস্তাব ভারতীয় রাজনীতিতে প্রাধান্য বজায় রাখে। যদিও ব্রিটিশ কর্মকর্তাগণ দাবি করেন যে, ক্রিপস প্রস্তাব তার সরলতা ও স্পষ্টতার জন্য চিহ্নিত, তথাপি ব্যাপক দ্ব্যর্থবোধকতা ও ভুলবোঝাবুঝির জন্য শেষ পর্যন্ত এটি বিফল হয়। শাসকদের দ্বারা রাষ্ট্রসমূহের প্রতিনিধি মনোনয়ন সম্পর্কে কংগ্রেস ভীষণ সমালোচনা মুখর ছিল। জওহরলাল নেহরু ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুদ্ধে ভারতীয়দের সমর্থন সংগঠিত করার জন্য জোরালোভাবে মত প্রকাশ করলেও কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ এবং গান্ধী নিজেও এ ব্যাপারে ছিলেন উদাসীন। ফলে কংগ্রেস-ব্রিটিশ সম্পর্ক তিক্ত হয় এবং অন্যান্য ঘটনা ভারত ছাড় আন্দোলন এর মতো সম্পূর্ণ সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে দ্রুত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। মিশনের ব্যর্থতার জন্য ক্রিপস কংগ্রেসকে দায়ী করে, অন্যদিকে কংগ্রেস এ দায়ভার চাপায় ব্রিটিশ সরকারের ওপর। এভাবে অবিভক্ত স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠার একটি বড় সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়।
[মোহাম্মদ শাহ]

মোহাম্মদ হোসেন খসরু,;(১৯০৩-১৯৫৯) উচ্চাঙ্গসঙ্গীতশিল্পী, সুরসাধক; ওস্তাদ খসরু নামে তিনি সমধিক পরিচিত। ১৯০৩ সালের ২ এপ্রিল কুমিল্লা শহরে মাতুলালয় প্রসিদ্ধ দারোগা বাড়িতে তাঁর জন্ম। এখানেই তিনি লালিতপালিত হন। তাঁর পিতৃনিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার মঈনপুর গ্রামে। পিতা জাইদুল হোসেন ছিলেন একজন বংশীবাদক।

মোহাম্মদ খসরু ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে প্রাদেশিক সমবায় বিভাগে চাকরিতে যোগদান করেন, কিন্তু সঙ্গীতসাধনা ও গানের জলসা নিয়ে ব্যাপৃত থাকায় চাকরিতে তাঁর উন্নতি হয়নি। তিনি কলকাতা ও লক্ষ্ণৌতে সঙ্গীতবিশেষজ্ঞ ওস্তাদদের নিকট উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিক্ষা করেন এবং শুদ্ধ রাগ, তাল, লয়, সুর ও বিভিন্ন শ্রেণির সঙ্গীতে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। অত্যন্ত কঠিন রাগ-রাগিণীতেও তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। রাজা-মহারাজাদের দরবারে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য তিনি আমন্ত্রিত হতেন। খেয়াল ও ঠুংরি গায়ক হিসেবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল; গজল গানেও তিনি দক্ষ ছিলেন। তিনি বাংলা, উর্দু ও হিন্দিতে বহু উচ্চাঙ্গসঙ্গীত রচনা করেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তাঁকে ‘দেশমণি’ বলে আখ্যাত করেন। যন্ত্রসঙ্গীত বিশেষত তবলা, সেতার ও এস্রাজে তিনি উচ্চমানের পারদর্শিতা লাভ করেন।

জীবনের শেষদিকে মোহাম্মদ খসরু স্বল্পকালের জন্য ঢাকার বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর অধ্যক্ষ ছিলেন। পাকিস্তান সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ (১৯৬২) উপাধি এবং বাংলাদেশ সরকার মরণোত্তর ‘শিল্পকলা একাডেমী পদক’ (১৯৭৮) প্রদান করে। ১৯৫৯ সালের ৬ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। [আলি নওয়াজ]

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, (১৮৬২-১৯৭২) বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে এক সঙ্গীতপরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা সবদর হোসেন খাঁ ওরফে সদু খাঁও ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ। মাতার নাম সুন্দরী বেগম। তাঁর সঙ্গীতগুরু ছিলেন আগরতলা রাজদরবারের সভাসঙ্গীতজ্ঞ তানসেনের কন্যাবংশীয় রবাবী ওস্তাদ কাশিম আলী খাঁ। মাতার নাম সুন্দরী বেগম। তাঁর সঙ্গীত গুরু ছিলেন আগরতলা রাজদরবারের সভাসঙ্গীতজ্ঞ তানসেনের কন্যাবংশীয় রবাবী ওস্তাদ কাশিম আলী খাঁ। আলাউদ্দিনের ডাক নাম ছিল ‘আলম’।

বাল্যকালে অগ্রজ ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁর নিকট সঙ্গীতে তাঁর হাতেখড়ি হয়। সুরের সন্ধানে তিনি দশ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে এক যাত্রাদলের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। ওই সময় তিনি জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, পাঁচালি প্রভৃতি গানের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে কলকাতা গিয়ে তিনি সঙ্গীতসাধক গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ওরফে নুলো গোপালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

সাত বছর পর নুলো গোপালের মৃত্যু হলে আলাউদ্দিন কণ্ঠসঙ্গীতের সাধনা ছেড়ে যন্ত্রসঙ্গীত সাধনায় নিযুক্ত হন। স্টার থিয়েটারের সঙ্গীতপরিচালক অমৃতলাল দত্ত ওরফে হাবু দত্তের নিকট তিনি বাঁশি, পিকলু, সেতার, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জো ইত্যাদি দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন। সে সঙ্গে তিনি লবো সাহেব নামে এক গোয়ানিজ ব্যান্ড মাস্টারের নিকট পাশ্চাত্য রীতিতে এবং বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ অমর দাসের নিকট দেশিয় পদ্ধতিতে বেহালা শেখেন; একই সময়ে তিনি মিসেস লবোর নিকট স্টাফ নোটেশনও শেখেন। এ ছাড়া হাজারী ওস্তাদের নিকট সানাই, নাকারা, টিকারা, জগঝম্প এবং নন্দবাবুর নিকট মৃদঙ্গ ও তবলা শেখেন। এভাবে তিনি সর্ববাদ্যে বিশারদ হয়ে ওঠেন।

আলাউদ্দিন খাঁ কিছুদিন ছদ্মনামে মিনার্ভা থিয়েটারে তবলা শিল্পী হিসেবে চাকরি করেন। অতঃপর ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার জগৎকিশোর আচার্যের আমন্ত্রণে তাঁর দরবারে সঙ্গীত পরিবেশন করতে যান। সেখানে ভারতের বিখ্যাত সরোদিয়া ওস্তাদ আহমেদ আলী খাঁর সরোদবাদন শুনে তিনি সরোদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তাঁর নিকট পাঁচ বছর সরোদে তালিম নেন। পরে ভারতখ্যাত তানসেন বংশীয় সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর নিকট সরোদ শেখার জন্য তিনি রামপুর যান। ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ রামপুরের নবাব হামেদ আলী খাঁর সঙ্গীতগুরু ও দরবার-সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। আলাউদ্দিন তাঁর নিকট দীর্ঘ ত্রিশ বছর সেনী ঘরানায় সঙ্গীতের অত্যন্ত দুরূহ ও সূক্ষ্ম কলাকৌশল আয়ত্ত করেন। তিনি প্রচুর গান রচনা করেছেন। তাঁর রচিত গানে তিনি ‘আলম’ ভনিতা ব্যবহার করেছেন।

১৯১৮ সালে নবাব তাঁকে মধ্য প্রদেশের মাইহার রাজ্যে প্রেরণ করেন। মাইহারের রাজা ব্রিজনারায়ণ আলাউদ্দিন খাঁকে নিজের সঙ্গীতগুরুর আসনে অধিষ্ঠিত করলে তিনি মাইহারে স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন। বেরিলির পীরের প্রভাবে তিনি যোগ, প্রাণায়াম ও ধ্যান শেখেন। এভাবে জীবনের একটা বড় অংশ আলাউদ্দিন শিক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন। এরপর শুরু হয় তাঁর কৃতিত্ব অর্জনের পালা। ১৯৩৫ সালে তিনি নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তিনিই ভারতীয় উপমহাদেশের রাগসঙ্গীতকে সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যের শ্রোতাদের নিকট পরিচিত করান। তিনি নৃত্যাচার্য উদয়শঙ্কর পরিচালিত নৃত্যভিত্তিক ‘কল্পনা’ শীর্ষক একটি ক্ল্যাসিকধর্মী ছায়াছবিতে আবহসঙ্গীতে সরোদ পরিবেশন করেন।

আলাউদ্দিন খাঁ সরোদে বিশেষত্ব অর্জন করেন। সহজাত প্রতিভাগুণে তিনি সরোদবাদনে ‘দিরি দিরি’ সুরক্ষেপণের পরিবর্তে ‘দারা দারা’ সুরক্ষেপণ-পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। সেতারে সরোদের বাদনপ্রণালী প্রয়োগ করে সেতারবাদনেও তিনি আমূল পরিবর্তন আনেন। এভাবে তিনি সঙ্গীতজগতে এক নতুন ঘরানার প্রবর্তন করেন, যা ‘আলাউদ্দিন ঘরানা’ বা শ্রেণী ‘মাইহার ঘরানা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

আলাউদ্দিনের পরামর্শ ও নির্দেশে কয়েকটি নতুন বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবিত হয়। সেগুলির মধ্যে ‘চন্দ্রসারং’ ও ‘সুরশৃঙ্গার’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি অনেক রাগ-রাগিণীও সৃষ্টি করেন, যেমন: হেমন্ত, দুর্গেশ্বরী, মেঘবাহার, প্রভাতকেলী, হেম-বেহাগ, মদন-মঞ্জরী, মোহাম্মদ (আরাধনা), মান্ঝ খাম্বাজ, ধবলশ্রী, সরস্বতী, ধনকোশ, শোভাবতী, রাজেশ্রী, চন্ডিকা, দীপিকা, মলয়া, কেদার মান্ঝ, ভুবনেশ্বরী ইত্যাদি। তিনি স্বরলিপিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর বহুগানের স্বরলিপি সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা গ্রন্থে নিয়মিত প্রকাশ হতো।

বহুসংখ্যক যোগ্য শিষ্য তৈরি তাঁর অপর কীর্তি। তাঁর সফল শিষ্যদের মধ্যে তিমিরবরণ, পুত্র আলী আকবর খান, জামাতা পন্ডিত রবিশঙ্কর, ভ্রাতুষ্পুত্র বাহাদুর হোসেন খান, কন্যা রওশন আরা বেগম (অন্নপূর্ণা), ফুলঝুরি খান, খাদেম হোসেন খান, মীর কাশেম খান, পন্ডিত যতীন ভট্টাচার্য, পান্নালাল ঘোষ, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পৌত্র আশীষ খান ও ধ্যানেশ খান, খুরশীদ খান, শরণরাণী, ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য, দ্যুতিকিশোর আচার্য চৌধুরী, যামিনীকুমার চক্রবর্তী, রণেন দত্ত রাজা রায়, শচীন্দ্রনাথ দত্ত, শ্যামকুমার গাঙ্গুলী, শ্রীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্তোষ প্রামাণিক এবং রাজা ব্রিজনারায়ণ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

তিনি সমাজসেবামূলক কাজ সম্পাদন করেছেন। শিবপুর গ্রামে তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন এবং পানি পানের জন্য একটি পুকুর খনন করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর নির্মিত মসজিদটি এখনও তাঁর স্মৃতিবহন করে চলছে।

তিনি বলতেন, সঙ্গীত আমার জাতি আর সুর আমার গোত্র।

মাইহার রাজ্যে, ‘মাইহার কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা তাঁর সঙ্গীত জীবনের এক শ্রেষ্ঠ অবদান। তিনি ছিলেন কলেজের সর্বেসর্বা পরিচালক। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সৃষ্ট কতিপয় রাগরাগিনীর পরিচয়:

মদন মঞ্জরী

সহধর্মিনী মদিনা বেগমের নামে এই রাগ পরিবেশনের সময় প্রাতঃকাল। আরোহী: সা গা ক্ষা ধা নি ধা নি র্পা। অবরোহী: র্সা নি ধা পা মা গা রে সা।।

রাগ মোহাম্মদ (আরাধনা)

এই রাগ পরিবেশনকাল প্রাতঃকাল। ভ্রাতুষ্পুত্র মোবারক হোসেন খানের অনুরোধে রচিত। আরোহী: সা রে গা মা পা নি র্সা। অবরোহী: র্সা নি পা মা গা রে সা।

রাগ শোভাবতী

সন্ধ্যাকালীন রাগ। আরোহী: সা, গা মা ধা নি র্সা। অবরোহী: র্সা নি ধা মা গা সা।

রাগ ধবলশ্রী

সন্ধ্যাকালের রাগ। আরোহী: সা খো মা পা নি র্সা। অবরোহী র্সা নি ধা পা ক্ষা গা ঋে সা।।

রাগ ভুবনেশ্বরী

প্রাতঃকালের রাগ। এই রাগটি স্ত্রী মদিনা বেগমকে উৎসর্গ করেন। আরোহী: সা রে গা মা পা ধা র্সা। অবরোহী: সা ধা পা মা গা রে সা।।

রাগ হেম বেহাগ

গভীর রাত্রিতে পরিবেশনের রাগ। আরোহী: সা গা মা পা নি র্সা। অবরোহী: র্সা নি ধা পা মা গা রে সা।।

রাগ স্বরস্বতী

রাত্রিবেলা পরিবেশনের কাফি ঠাটের রাগ। আরোহী: সা রে জ্ঞা মা ধা মা ধা র্পা। অবরোহী: র্সা নি ধা মা জ্ঞা মা জ্ঞা, রে সা।।

তিনি দেশিয় বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে অর্কেস্ট্রার স্টাইলে একটি যন্ত্রীদল গঠন করে নাম দেন ‘রামপুর স্ট্রিং ব্যান্ড’। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘খাঁ সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করে। অতঃপর ভারত সরকার তাঁকে একে একে ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমী সম্মান’ (১৯৫২), ‘পদ্মভূষণ’ (১৯৫৮) ও ‘পদ্মবিভূষণ’ (১৯৭১); বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ‘দেশিকোত্তম’ (১৯৬১) এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডক্টর অব ল’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫৪ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক প্রথম সঙ্গীত নাটক আকাদেমীর ফেলো নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল তাঁকে আজীবন সদস্যপদ দান করে। তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে আমন্ত্রিত অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এসব দুর্লভ সম্মান ও খেতাব সঙ্গীতবিদ্যায় আলাউদ্দিন খাঁর অসাধারণ কীর্তি ও সাফল্যকেই সূচিত করে।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর তালিমের গুণে তাঁর পুত্র সরোদশিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খান বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন। ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’ এবং তাঁর জামাতা সেতারশিল্পী পন্ডিত রবিশঙ্কর বিশ্বখ্যাত হয়েছেন এবং ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’, ‘পদ্মবিভূষণ, ও ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
[মোবারক হোসেন খান]

রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন, (১৮৮০-১৯৩২) সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক এবং নারী জাগরণ ও নারীর অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার অন্তর্গত পায়রাবন্দ ইউনিয়নে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জহীরুদ্দীন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের এবং মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রোকেয়ার পূর্বপুরুষগণ মুগল আমলে উচ্চ সামরিক এবং বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োজিত ছিলেন। বিয়ের পরে তাঁর নাম হয় রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন। তবে তিনি বেগম রোকেয়া নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন।

বেগম রোকেয়ার পিতা জহীরুদ্দীন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের আরবি, উর্দু, ফারসি, বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন রক্ষণশীল। রোকেয়ার বড় দু’ভাই মোহাম্মদ ইব্রাহীম আবুল আসাদ সাবের ও খলিলুর রহমান আবু যায়গাম সাবের ছিলেন বিদ্যানুরাগী। তাঁরা কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অধ্যয়ন করেন। ফলে ইংরেজি শিক্ষা ও সভ্যতার সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ঘটে এবং তা তাঁদের চিন্তাচেতনাকে প্রভাবিত করে। রোকেয়ার বড় বোন করিমুন্নেসা ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও সাহিত্যানুরাগী। সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও ভাইদের সহায়তায় তিনি বাড়িতে পড়াশোনার সুযোগ লাভ করেন। সামাজিক ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে রচিত তাঁর কবিতা সমকালীন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। বেগম রোকেয়ার শিক্ষালাভ, সাহিত্যচর্চা এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ গঠনে বড় দু’ভাই ও বোন করিমুন্নেসার যথেষ্ট অবদান ছিল।

রোকেয়া যে সামাজিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠেন, সেখানে মুসলমান মেয়েদের গৃহের অর্গলমুক্ত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ ছিল না। পাঁচ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস করার সময় একজন মেম শিক্ষয়িত্রীর নিকট তিনি কিছুদিন লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সমাজ ও আত্মীয়স্বজনদের ভ্রুকুটির জন্য তাও বন্ধ করে দিতে হয়। তবু রোকেয়া দমে যাননি। বড় ভাই-বোনদের সমর্থন ও সহায়তায় তিনি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাই ভালভাবে আয়ত্ত করেন।

১৮৯৮ সালে রোকেয়ার বিয়ে হয় বিহারের ভাগলপুর নিবাসী উর্দুভাষী সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে। তিনি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তদুপরি সমাজসচেতন, কুসংস্কারমুক্ত এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। রোকেয়ার জীবনে স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেনের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সাহচর্যে এসেই রোকেয়ার জ্ঞানচর্চার পরিধি বিস্তৃত হয়। উদার ও মুক্তমনের অধিকারী স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় রোকেয়া দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন এবং ক্রমশ ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর সাহিত্যচর্চার সূত্রপাতও ঘটে স্বামীর অনুপ্রেরণায়। তবে রোকেয়ার বিবাহিত জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯০৯ সালের ৩ মে সাখাওয়াৎ হোসেন মারা যান। ইতোপূর্বে তাঁদের দুটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে অকালেই মারা যায়।

স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ রোকেয়া নারীশিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর স্বামীর প্রদত্ত অর্থে পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে তিনি ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল স্থাপন করেন। কিন্তু পারিবারিক কারণে রোকেয়া ভাগলপুর ছেড়ে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন। ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতার ১৩ নং ওয়ালিউল­াহ লেনের একটি বাড়িতে মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে তিনি নবপর্যায়ে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। রোকেয়ার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯১৭ সালে এই স্কুল মধ্য ইংরেজি গার্লস স্কুলে এবং ১৯৩১ সালে উচ্চ ইংরেজি গার্লস স্কুলে রূপান্তরিত হয়। ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণসহ অন্যান্য কারণে স্কুলটি বহুবার স্থান বদল করে। বিভিন্ন সময় স্কুলটির অবস্থান ছিল ১৩, ইউরোপীয়ান অ্যাসাইলাম লেন (১৯১৩), ১৬২, লোয়ার সার্কুলার রোড (১৯৩২), ১৭, লর্ড সিনহা রোড (১৯৩৮) এবং আলীপুর হেস্টিংস হাউস (১৯৩৮)। ১৯৬৮ সালে এটি ১৭ নং লর্ড সিনহা রোডের নিজস্ব বাড়িতে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয়। প্রায় দুই যুগ ধরে বেগম রোকেয়া তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন স্কুল পরিচালনায়। বিরূপ সমালোচনা ও নানাবিধ সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে তিনি এই প্রতিষ্ঠানটিকে সে যুগের মুসলমান মেয়েদের শিক্ষালাভের অন্যতম পীঠস্থানে পরিণত করেন। এটি ছিল তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শের বাস্তবায়ন। শৈশব থেকে মুসলমান নারীদের যে দুর্দশা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করাই ছিল এই স্কুল প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য। তাঁর স্কুলে মেয়েদের পাঠাবার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি অভিভাবকদের অনুরোধ করতেন। যে যুগে কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে বাঙালি মুসলমানরা মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করত, সেই অন্ধকার যুগে বেগম রোকেয়া পর্দার অন্তরালে থেকেই নারীশিক্ষা বিস্তারে প্রয়াসী হন এবং মুসলমান মেয়েদের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তিলাভের পথ সুগম করেন। প্রথমদিকে কেবল অবাঙালি ছাত্রীরাই পড়ত সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল স্কুলে। রোকেয়ার অনুপ্রেরণায় ক্রমশ বাঙালি মেয়েরাও এগিয়ে আসে পড়াশোনার জন্য। ছাত্রীদের পর্দার ভিতর দিয়েই ঘোড়ার গাড়িতে করে স্কুলে আনা-নেওয়া করা হতো।

সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল স্কুলে তফসিরসহ কুরআন পাঠ থেকে আরম্ভ করে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি, হোম নার্সিং, ফার্স্ট এইড, রান্না, সেলাই, শরীরচর্চা, সঙ্গীত প্রভৃতি বিষয়ই শিক্ষা দেওয়া হতো। স্কুল পরিচালনা এবং পাঠদানে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বেগম রোকেয়া বিভিন্ন বালিকা স্কুল পরিদর্শন করতেন। পর্যবেক্ষণ করতেন সেসব স্কুলের পাঠদান পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে তিনি কলকাতার শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ইংরেজ, বাঙালি, ব্রাহ্ম, খিস্টান সব শ্রেণীর মহিলাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন এবং তাঁদের আন্তরিক সহযোগিতা লাভ করেন। তিনি নিজেই স্কুলের শিক্ষিকাদের ট্রেনিং দিতেন। কলকাতায় উপযুক্ত শিক্ষয়িত্রী না পাওয়ায় রোকেয়া মাদ্রাজ, গয়া, আগ্রা প্রভৃতি স্থান থেকে ভাল শিক্ষয়িত্রী নিয়ে আসেন। তাঁর বারংবার আবেদনের ফলেই ১৯১৯ সালে সরকার কলকাতায় ‘মুসলিম মহিলা ট্রেনিং স্কুল’ স্থাপন করে। স্কুলের জন্য সরকারি সাহায্য এবং সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা আদায় ছিল রোকেয়ার জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এ কাজেও সামাজিক বিরুদ্ধতা আর কঠিন সমালোচনাকে উপেক্ষা করে তিনি সফলতা লাভ করেন।

সাহিত্যিক হিসেবে তৎকালীন যুগের প্রেক্ষাপটে রোকেয়া ছিলেন এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারতমহিলা, আল-এসলাম, নওরোজ, মাহে নও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, The Mussalman, Indian Ladies Magazine প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে নবনূর পত্রিকায়। মতান্তরে, তাঁর প্রথম লেখা ‘পিপাসা’ (মহরম) প্রকাশিত হয় ইংরেজি ১৯০২ সালে, চৈত্র ও বৈশাখ ১৩০৮-১৩০৯ (যুগ্মসংখ্যা) নবপ্রভা পত্রিকায়। সমকালীন সাময়িক পত্রে মিসেস আর.এস হোসেন নামে তাঁর রচনা প্রকাশিত হতো। রোকেয়ার সমগ্র সাহিত্যকর্মের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে সমাজের কুসংস্কার ও অবরোধ প্রথার কূফল, নারীশিক্ষার পক্ষে তাঁর নিজস্ব মতামত, নারীদের প্রতি সামাজিক অবমাননা এবং নারীর অধিকার ও নারী জাগরণ সম্পর্কে তাঁর প্রাগ্রসর ধ্যানধারণা। বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধেও তাঁর লেখনী ছিল সোচ্চার। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর দুরবস্থা এবং দৈহিক-মানসিক জড়ত্ব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় যে শিক্ষা এ ধারণাই রোকেয়া তুলে ধরেন তীক্ষ্ণ ভাষায় ও তীর্যক ভঙ্গিতে। এক প্রতিকূল সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের খন্ড খন্ড চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর রচনায়। সমাজের নিচুতলার মানুষের জীবনের দুর্দশার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তাঁর বহু প্রবন্ধ ও নকশাজাতীয় রচনায়।

ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও শে­ষাত্মক রচনায় বেগম রোকেয়ার স্টাইল ছিল স্বকীয় বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। উদ্ভাবনা, যুক্তিবাদিতা এবং কৌতুকপ্রিয়তা তাঁর রচনার সহজাত বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রবন্ধের বিষয় ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত। বিজ্ঞান সম্পর্কেও তাঁর অনুসন্ধিৎসার পরিচয় পাওয়া যায় বিভিন্ন রচনায়। সমকালীন যুগের বিদ্যানুরাগী সমাজহিতৈষী পুরুষ এবং মহিলাদের নিকট থেকে বেগম রোকেয়া নানাভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেন। সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাঁকে উৎসাহিত করেন স্বাধীন মতামত প্রকাশের জন্য। সওগাতের সঙ্গে বেগম রোকেয়ার সম্পৃক্ততা ছিল নিবিড়। এ পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যার (অগ্রহায়ণ ১৩২৫) প্রথম পৃষ্ঠায় রোকেয়ার ‘সওগাত’ কবিতাটি ছাপা হয়। এছাড়া তাঁর বহু প্রবন্ধ ও কবিতা সওগাতে প্রকাশিত হয়।

রোকেয়ার উলে­খযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে: মতিচূর (প্রবন্ধ, ২ খন্ড: ১ম খন্ড ১৯০৪, ২য় খন্ড ১৯২২), Sultana’s Dream (নকশাধর্মী রচনা, ১৯০৮), পদ্মরাগ (উপন্যাস, ১৯২৪), অবরোধবাসিনী (নকশাধর্মী গদ্যগ্রন্থ, ১৯৩১) প্রভৃতি। এছাড়া আছে অসংখ্য প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও অনুবাদ। Sultana’s Dream গ্রন্থটি রোকেয়া নিজেই বাংলায় অনুবাদ করেন সুলতানার স্বপ্ন নামে। এটি একটি প্রতীকী রচনা এবং এতে বর্ণিত Lady Land বা নারীস্থান মূলত রোকেয়ারই স্বপ্নকল্পনার প্রতীক। মতিচূর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, সুলতানার স্বপ্ন প্রভৃতি গ্রন্থে রোকেয়ার ঐকান্তিক স্বপ্নই এক অভিনব রূপ পেয়েছে। মতিচূর ২য় খন্ডে আছে ‘সৌরজগৎ’, ‘ডেলিসিয়া হত্যা’ (মেরী করেলী রচিত Murder of Delicia, ১৮৯৬ উপন্যাসের গল্পাংশের অনুবাদ), ‘জ্ঞান-ফল’, ‘নারী-সৃষ্টি’, ‘নার্স নেলী’, ‘মুক্তি-ফল’ প্রভৃতি গল্প ও রূপকথা। বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা তাঁর অসংখ্য চিঠিপত্র রয়েছে। বাংলা ভাষার প্রতি ছিল তাঁর গভীর মমত্ববোধ। সে যুগের অভিজাত শ্রেণীর মুসলমানদের ভাষা ছিল উর্দু। কিন্তু রোকেয়া উপলব্ধি করেন যে, এদেশের অধিকাংশ মুসলমানের ভাষা বাংলা। তাই বাংলা ভাষা ভালভাবে আয়ত্ত করে এই ভাষাকেই তাঁর বক্তব্য প্রকাশের বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৯২৭ সালে বঙ্গীয় নারী শিক্ষা সম্মেলনে বেগম রোকেয়া বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন যা সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল দুঃসাহসিক কাজ।

প্রায় সব রচনাতেই রোকেয়া প্রকাশ করেছেন ধর্মীয় বিধানের অপব্যবহারের কথা, সে যুগের নারীদের শারীরিক, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবরুদ্ধতার কথা। কোনো কোনো রচনায় প্রকাশিত হয়েছে সমাজ উন্নয়নে নারী-পুরুষের যৌথ অবদানের গুরুত্ব। এমনকি কিছু রচনায় নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও তার বিভিন্ন মাত্রিকতার বিশে­ষণে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং সংস্কারমুক্ত আধুনিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সমকালীন রাজনীতির প্রসঙ্গও স্থান পেয়েছে তাঁর লেখায়। মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি এবং শাণিত লেখনীর মধ্য দিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ শতকের একজন বিরল ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। সে যুগের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সরোজিনী নাইডু, তদানীন্তন বড়লাট পত্নী লেডী চেমসফোর্ড, লেডী কারমাইকেল, ভূপালের বেগম সুলতান জাহান প্রমুখ মহিলা বেগম রোকেয়ার সাহিত্য ও সামাজিক কর্মকান্ডের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং তাঁর কাজের প্রতি তাঁদের সমর্থন ব্যক্ত করেন।

বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীর স্বাতন্ত্র্য ও নারী স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর বেগম রোকেয়া। বিশ শতকের প্রথম দিকে বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের সূচনালগ্নে নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণে তিনিই প্রধান নেতৃত্ব দেন। মুসলমান সমাজের ঘোর অন্ধকার যুগে নারী জাগরণের ক্ষেত্রে রোকেয়ার ভূমিকা ছিল একক, ব্যতিক্রমী এবং অনন্যসাধারণ। অবরোধ প্রথার শেকল ভেঙে তিনি বেরিয়ে আসেন অসামান্য সাহস, প্রবল আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। বেগম রোকেয়াই প্রথমবারের মতো বাঙালি মুসলিম সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অধিকারের দাবি তুলে ধরেন এবং নারী স্বাধীনতার পক্ষে নিজের মতবাদ প্রচার করেন।

সাহিত্যচর্চা, সংগঠন পরিচালনা ও শিক্ষাবিস্তার এই ত্রিমাত্রিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বেগম রোকেয়া সমাজ সংস্কারে এগিয়ে আসেন এবং স্থাপন করেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল নারীশিক্ষার প্রসার, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি এবং মুসলমান সমাজের অবরোধ প্রথার অবসান। শিক্ষা ব্যতীত নারীজাতির অগ্রগতি ও মুক্তি সম্ভব নয়, এ সত্য অনুধাবন করেই তিনি নারীশিক্ষা প্রসারের কাজে ব্রতী হন। নারীদের তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন মানুষ হিসেবে এবং সমাজের অর্ধেক হিসেবে নারীর মর্যাদার স্বীকৃতির লক্ষ্যেই পরিচালিত হয় তাঁর সমগ্র প্রয়াস। তাঁর মধ্যে ছিল একজন যোগ্য শিক্ষকের প্রজ্ঞা, সমাজসংস্কারকের অন্তর্দৃষ্টি এবং মানবতাবাদীর নির্মল চেতনা।

বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে বেগম রোকেয়ার অবদান চিরঅম্লান। মুসলমান মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের অধিকার আদায়ের জন্য ১৯১৬ সালে বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করেন আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম বা মুসলিম মহিলা সমিতি। তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার অন্যতম ক্ষেত্র এই মহিলা সমিতি। এ সমিতির ইতিহাসের সঙ্গে রোকেয়ার সংগ্রামী কর্মজীবনের কাহিনী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মুসলিম মহিলা সমিতি থেকে বহু বিধবা নারী অর্থ সাহায্য পেয়েছে, বহু দরিদ্র মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছে, অসংখ্য অভাবী মেয়ে সমিতির অর্থে শিক্ষালাভ করেছে, সমাজ-পরিত্যক্ত অসহায় অনাথ শিশুরা আশ্রয় ও সাহায্য পেয়েছে। শুধু তাই নয়, কলকাতার মুসলমান নারী সমাজের ক্রমোন্নতির ইতিহাসে এই সমিতির উলে­খযোগ্য অবদান ছিল। লোকচক্ষুর অন্তরালে এই সমিতি মুসলমান নারীদের কল্যাণে বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করেছে। সমিতিতে যোগদানের জন্য রোকেয়া নানা অপবাদ মাথা পেতে নিয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে মহিলাদের অনুপ্রাণিত করেছেন। এই সমিতি ভারতবর্ষের শাসন-সংস্কারে নারীর রাজনৈতিক অধিকার সম্বন্ধে মতামত তুলে ধরে। নারীদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য এই সমিতি শিল্প প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করে। নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেগম রোকেয়ার নেতৃত্বে আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম সে যুগে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনে যেসব মহিলা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই বেগম রোকেয়ার স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করে তাঁরই আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং আলোর দিশারী বেগম রোকেয়ার জীবনকাল ছিল মাত্র বায়ান্ন বছর। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।
[শাহীদা আখতার]

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, (১৯১১-১৯৩২) বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৯১১ সালে চট্টগ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জগবন্ধু ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার হেড ক্লার্ক। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার মাস্টারদা সূর্যসেন-এর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রামে প্রীতিলতাকে প্রথম আত্মোৎসর্গকারী নারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রীতিলতা চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন।

এরপর তিনি ১৯২৯ সালে ঢাকা ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তি হন এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এর দুই বৎসর পর প্রীতিলতা কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে ডিস্টিংশনসহ গ্রাজুয়েশন করেন। ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাকালে প্রীতিলতা লীলা নাগের নেতৃত্বাধীন দীপালি সংঘের অন্তর্ভুক্ত শ্রীসংঘের সদস্য এবং কলকাতার বেথুন কলেজের ছাত্রী থাকাকালে কল্যাণী দাসের নেতৃত্বাধীন ছাত্রীসংঘের সদস্য হন। গ্রাজুয়েশন করার পর তিনি চট্টগ্রামের নন্দনকানন অপর্ণাচরণ নামক একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৩০ সালে সমগ্র বাংলা জুড়ে অনেক বিপ্লবী দল সংগ্রামরত ছিল। ঐসব দলের সদস্যরা বিশ্বাস করত যে, কেবল সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারে। এক্ষেত্রে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গোপন দলিলপত্র পাঠ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হন। প্রীতিলতার এক ভাই মাস্টারদাকে তাঁর বিপ্লবী চেতনা সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রীতিলতা সূর্যসেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের প্রথম মহিলা সদস্য হন। তিনি টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস এবং রিজার্ভ পুলিশ লাইন দখল অভিযানে যুক্ত ছিলেন। তিনি জালালাবাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৩০ সালে প্রীতিলতা কলকাতাস্থ আলীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত রাজবন্দি রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে যথাসময়ে তা পালন করেন। ১৯৩২ সালের ১৩ জুন ধলঘাট সংঘর্ষে কয়েকজন বিপ্লবী প্রাণ হারান। মাস্টারদা ও প্রীতিলতা পালাতে সক্ষম হন। শিগগির পুলিশের জরুরি গ্রেফতারি তালিকায় প্রীতিলতার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। মাস্টারদা তাঁকে স্কুল ছেড়ে দিয়ে পুরুষ বিপ্লবীদের মতো আত্মগোপন করার নির্দেশ দেন। প্রীতিলতা অপর একজন বিপ্লবী নারী কল্পনা দত্তসহ গোপন আস্তানায় চলে যান। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ’ এইরূপ অবমাননামূলক কথার জন্য ক্লাবটির দুর্নাম ছিল। ক্লাব আক্রমণ সফল করে পুরুষবেশী প্রীতিলতা সামরিক কায়দায় তাঁর বাহিনীকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই সময়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হলে তাৎক্ষণিকভাবে পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর আত্মদান বিপ্লবীদের সশস্ত্র সংগ্রামে আরো উজ্জিবিত করে তোলে।
[সোনিয়া নিশাত আমিন]

আন্ডারপ্রিভিলেজড্ চিলড্রেনস্ এডুকেশনাল প্রোগ্রামস্ বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এনজিও। এর লক্ষ্য দরিদ্র ও কর্মজীবী শিশুকিশোরদের সাধারণ শিক্ষাদানের পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রদান এবং তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। ইউসেপ এসক্যাপের তালিকাভুক্ত একটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব উপকূল দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন এলাকার মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার জন্য নিউজিল্যান্ড থেকে লিন্ডসে অ্যালেন চেইনী নামে একজন সেবাকর্মী একটি ব্রিটিশ ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে এ দেশে আসেন। ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি গৃহহীন ও দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে ডেনমার্ক সরকার আর্থিক সহায়তাসহ একটি তিনবছর মেয়াদি প্রকল্প অনুমোদন করে। শুরুর দিকে ইউসেপ কমিউনিটি স্কুলের মডেল অনুযায়ী দরিদ্র ও কর্মজীবী শিশুদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। স্কুলবহির্ভূত দরিদ্র শিশুদের জন্য ইউসেপ মডেল সমাদৃত হয়। ইউসেপ ১৯৮৩ সালে সাধারণ শিক্ষাদান কর্মসূচির সাথে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করে এবং এ লক্ষ্যে ঢাকায় একটি কারিগরি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। এই সময়ের মধ্যে ইউসেপের শিক্ষা কার্যক্রম চট্টগ্রাম এবং খুলনা শহরে সম্প্রসারিত হয়। সমাজকল্যাণ (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর অধীনে ১৯৯০ সালে ইউসেপ একটি জাতীয় এনজিও হিসেবে নিবন্ধিত হয়।

ইউসেপ ২০০০ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং রাজশাহীতে ৩০টি সাধারণ বিদ্যালয় এবং ৩টি কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করে। সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা শেষে ছাত্রছাত্রীরা যাতে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে সেজন্য ইউসেপ বিভিন্ন চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। ২০০৩ সাল থেকে ইউসেপ দেশের বাইরেও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। এরই মধ্যে ১১৬ জন ইউসেপ থেকে শিক্ষাগ্রহণ শেষে বিদেশে চাকুরি নেয়। ইউসেপ ২০০৪ সাল থেকে ’লেট চিল্ড্রেন স্পিক’ নামে শিশু অধিকার বিষয়ে একটি এ্যাডভোকেসি প্রোগ্রাম চালু করে। এই প্রোগ্রামের মূল উদ্দেশ্য সকল শিশুকে স্কুলমুখী করা ও সব ধরনের শিশু নির্যাতন বন্ধে শিশুদের এবং অভিভাবকদের সচেতন করা। ২৪টি পার্টনার এনজিওর মাধ্যমে ১০টি জেলায় এ প্রোগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে। ২০০৫ সাল থেকে ইউসেপ শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ প্রকল্প শুরু করে যার মাধ্যমে ইউসেপ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করে এরা নিজেরাই ব্যবসা করে স্বনির্ভর হতে পারে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড-এর অধীনে ইউসেপের এসএসসি ভোকেশনাল প্রোগ্রামে এ পর্যন্ত ৩৭৮ জন ছাত্র পাশ করে। এসএসসি ভকেশনাল শিক্ষা শেষে যেসব মেধাবী ছাত্রছাত্রী আরো পড়াশোনা করতে চায় তাদের জন্য ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং স্পনসরশিপ প্রোগ্রাম-এর ব্যবস্থা রয়েছে। ২০০৭ সালে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম চালু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১২৫ জন এর অধীনে শিক্ষা সম্পন্ন করে। ২০০৯ সাল থেকে ইউসেপ সাধারণ কারিগরি সমন্বিত বিদ্যালয়সমূহে প্রথম শ্রেণি থেকে ইংলিশ ইন অ্যাকশন প্রোগ্রাম এবং কম্পিউটার ক্লাস শুরু করে। ২০১০ সালের মধ্যে ইউসেপ বালাদেশের সকল বিভাগীয় শহরে এবং গাজীপুর জেলা শহরে এর কর্মকান্ড বিস্তৃত করে। প্রতিষ্ঠানটি ৫২টি সমন্বিত সাধারণ ও কারিগরি বিদ্যালয় ও ১০টি কারিগরি বিদ্যালয় পরিচালনা করে যেখানে ৩৭,০০০ দরিদ্র ও কর্মজীবী শিশুকিশোর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। প্ল্যান বাংলাদেশের সহায়তায় ইউসেপ ঢাকায় ২টি এবং বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ১টি কারিগরি বিদ্যালয় পরিচালনা করছে।

ইউসেপের সাধারণ বিদ্যালয়সমূহ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক বোর্ড অনুমোদিত শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই অনুসরণ করে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সমাজ ও বিজ্ঞান বিষয়ের সাথে ইউসেপ প্রণীত নিজস্ব বই পড়ানো হয়। ভর্তির পূর্বে পরিবারে গিয়ে শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করার পর তাদের শিক্ষা চাহিদা নিরূপণ করা হয়। এভাবে চার দশকের অভিজ্ঞতা, জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে ইউসেপ শহরের দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাচাহিদার একটি সাধারণ রূপরেখা তৈরি করে। ইউসেপের স্কুল ব্যবস্থা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার জন্য সমর্থন ও সহযোগিতা দানে উদ্বুদ্ধ করে। ইউসেপের স্কুলসমূহের নিজস্ব স্ট্র্যাটেজি রয়েছে যা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাকাঠামোকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। ইউসেপের নীতি হচ্ছে সংক্ষিপ্ত সেমিস্টার আয়োজন, সংক্ষেপিত পাঠ্যক্রম ব্যবহার এবং শিক্ষার পাশাপাশি কাজে অংশগ্রহণ। ইউসেপ পরিচালিত সকল বিদ্যালয় বস্তি ও কারখানা এলাকাতে শিশুর কাজের জায়গা নির্ধারণ করে। শিশুর শিক্ষা নির্বিঘ্ন ও কার্যকর রাখতে ইউসেপের শিক্ষকরা সংশ্লিষ্ট পরিবারের লোকজন ও তাদের কর্মস্থলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, রংপুর এবং গাজীপুরে দশটি কারিগরি বিদ্যালয়ের মাধমে ইউসেপ বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ইউসেপের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ব্যয় সাশ্রয়ী এবং একটি কর্মজীবী শিশুকে ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের মধ্যে মৌলিক কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শী করে তোলে। ইউসেপের ১৭টি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কোর্সের মধ্যে রয়েছে অটো মেকানিক্স, ওয়েলডিং এন্ড ফেব্রিকেশন, মেশিনিষ্ট, প্লাম্বিং এন্ড পাইপ ফিটিং, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল, ইলেকট্রনিক টেকনলজি, রেফ্রিজারেশন এন্ড এয়ার কন্ডিশনিং, অফসেট প্রিন্টিং টেকনলজি, ইন্ডাসট্রিয়াল উড ওয়ার্কিং, টেইলরিং এন্ড ইন্ডাসট্রিয়াল সিউইং অপারেশন, ইন্ডাসট্রিয়াল উল নিটিং অপারেশন, গারমেন্টস ফিনিসিং এন্ড কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ইন্ডাসট্রিয়াল গার্মেন্টস মেশিন মেকানিক্স, টেক্সটাইল ওয়েভিং মেকানিক্স, টেক্সটাইল স্পিনিং মেকানিক্স, টেক্সটাইল নিটিং মেকানিক্স এবং এইড টু নার্স।

ইউসেপের মূল লক্ষ্য শহরাঞ্চলের দরিদ্র ও কর্মজীবী শিশুদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখা। ইউসেপ ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি বোর্ড অব গভর্নরস দ্বারা পরিচালিত। বোর্ড ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট ইউসেপ এসোসিয়েশন সদস্যের মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়। ইউসেপের প্রধান একজন নির্বাহী পরিচালক এবং তাকে সহায়তা করেন দুজন পরিচালক ও সাতজন ব্যবস্থাপক। ১৬৭৬ জন কর্মী নিয়ে ইউসেপ গঠিত। ইউসেপ কর্মীদের ৩০ শতাংশ মহিলা। ইউসেপ বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকে। এই সকল বিদেশি সংস্থার একটি কনসোর্টিয়াম আছে যা প্রকল্প দলিলের মাধ্যমে ইউসেপকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। ২০১০ সালে এই কনসোর্টিয়ামের সদস্য হলো ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশানাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি), দি রয়েল ড্যানিস এম্ব্যাসি (ডানিডা), সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এসডিসি) এবং সেইভ দ্য চিলড্রেন সুইডেন-ডেনমার্ক (এসসিএসডি)। ইউসেপের তহবিলের অন্যান্য উৎসের মধ্যে রয়েছে ইউসেপ বেনিফিসিয়ারিদের আর্থিক সাহায্য, স্টুডেন্ট স্পন্সরশিপ, সেবামূলক অনুদান এবং সরকার, সিটি কর্পোরেশন ও ব্যক্তি কর্তৃক দানকৃত জমি।

১৯৭২-২০১০ সালে ইউসেপ শহর এলাকার ১,৭১,০১৬ জন কর্মজীবী দরিদ্র শিশুকে সাহায্য করেছে। এদের মধ্যে ইউসেপের সাধারণ বিদ্যালয় থেকে ৯৫,০২৬ জন ছাত্র ৫ম শ্রেণি এবং ৭১,৫৩৬ ছাত্র অষ্টম শ্রেণি পাস করেছে। ১৯৮৩ সাল থেকে এই পর্যন্ত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ শেষ করেছে ৩৮,৩১৮ জন শিশু। ২০১০ সালে ইউসেপের বিভিন্ন বিদ্যালয় ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৩৭,০০০। ২০১০ সালের জন্য ইউসেপের বাজেট ২,০৪০,৮৭৩,৬৬ টাকা। এসক্যাপ ইউসেপকে ১৯৯৫ এবং ১৯৯৭ সালে মানবসম্পদ উন্নয়ন সংস্থাসমূহের প্রতিযোগিতায় রানারস আপ ঘোষণা করে।
[শামসুল হুদা]

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনঃ- বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংস্থা এনজিও। ‘স্রষ্টার এবাদত ও সৃষ্টির সেবা’ লক্ষ্য নিয়ে ১৯৫৮ সালে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা এটি প্রতিষ্ঠা করেন। মিশনটি এখন দেশের বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থাগুলির মধ্যে একটিতে পরিণত হয়েছে। এটি সমাজকল্যাণ পরিদফতরে একটি স্বেচ্ছাসেবামূলক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধনকৃত।

আহ্ছানিয়া মিশন ৪টি বিভাগে উন্নয়নের জন্য কাজ করছে- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। গত তিন দশকে আহ্ছানিয়া মিশন যেসব ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করেছে তাহলো- অপ্রাতিষ্ঠানিক মৌলিক ও অব্যাহত শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, লিঙ্গ উন্নয়ন, পরিবেশ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ, শিশু অধিকার এবং শিশুশ্রম রোধ, ধূমপান ও মাদকাসক্ত এবং এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ, দারিদ্র বিমোচন, নিরাজদ পানি ও স্যানিটেশন, শিশু ও নারী পাচার রোধ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ইত্যাদি। ইতোমধ্যে মিশন জাতিসংঘের ইকোসোক (UN Economic and Social Council, ECOSOC) এর Consultative Status এবং ইউনোস্কের Operational Relations গ্রহণ করেছে।

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন সাক্ষরতা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের অধীনে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রদান করে। মিশন বর্তমানে অব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় সারা দেশে ১১৭০টি গণকেন্দ্র (কমিউনিটি ভিত্তিক শিক্ষা ও উন্নয়ন কেন্দ্র) পরিচালনা করছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় মিশন এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারসহ দেশে কর্মরত বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার ১,০১,১৮৬ জনকে সাক্ষরতা ও উন্নয়ন কর্মবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। শিক্ষা উপকরণ উন্নয়নে আহ্ছানিয়া মিশন দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি সংস্থা। মিশন এপর্যন্ত ২৭টি বিষয়ের ওপর গণশিক্ষা ও অব্যাহত শিক্ষা ক্ষেত্রে ২৬৩টি তথ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ সম্পর্কিত উপকরণ প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত কার্যক্রমে এসকল উপকরণ ব্যবহূত হচ্ছে।

মিশন দরিদ্র মহিলাদের দারিদ্র্য-বিমোচনে এবং সার্বিকভাবে নারী উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এ পর্যন্ত ১.৯ মিলিয়ন মহিলার শিক্ষা ও আর্থিক উন্নয়নে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেছে। মিশন পানি ও স্যানিটেশন কার্যক্রমের আওতায় ৮টি উপকূলীয় জেলার ২৮টি উপজেলার ৩০০টি ইউনিয়নে ৭.৫ মিলিয়ন লোকের জন্য একটি বৃহদাকারের সেনিটেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এবং আর্সেনিক মোকাবিলায় পানি পরীক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে। অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে মিশন দেশের ৪৯টি জেলার ১০৭টি থানায় কাজ করছে। মিশন দেশে ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য ঢাকার মিরপুরে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। সরকার, করপোরেট শাখা ও জনসাধারণের অর্থায়নে মিশন ঢাকার উল্টরায় ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট আর্ন্তজাতিক মানের ক্যান্সার ও সর্বজনীন হাসপাতাল নির্মাণের কাজ করছে।

মিশন বেসরকারি পর্যায়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভিত্তিক দেশে আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বেসরকারি খাতে প্রথম খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ স্থাপন, কর্মজীবী শিশু-কিশোরদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও আহ্ছানউল্লা ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি এবং আহ্ছানিয়া মিশন কলেজ স্থাপন করে। মিশন সুফিবাদ চর্চার জন্য আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম নামে একটি প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করে। মাদক দ্রব্যের মরণ নেশা থেকে দেশের যুবসমাজকে বাঁচানোর জন্য মিশন সারা দেশে তামাক ও তামাক জাতীয় দ্রব্যের কুফল ও এইচআইভি/এইডস সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছে। তাছাড়া এটি ধাত্রী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে।

বর্তমানে মিশন মাদকাসক্ত যুবকদের উন্নয়নের মূলধারায় পুনর্বাসনের জন্য ঢাকা, ময়মনসিংহ ও যশোরে ৪ টি মাদকের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনা করছে। নারী ও শিশু পাচার রোধে কাজ করছে। দেশের সীমান্তবর্তী ৬ টি জেলার ১৭ টি উপজেলায় এ কার্যক্রম বিস্তৃত। পাচার হতে উদ্ধারকৃত নারী ও শিশুদেরকে আশ্রয় এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে মিশন যশোরে একটি ৪০ শয্যা বিশিষ্ট আশ্রয়গৃহ স্থাপন করেছে।

মিশন সামাজিক ব্যবসা হিসেবে হজ্জ্ব ফাইন্যান্স কোম্পানি, আহ্ছানিয়া মিশন বুক ডিস্ট্রিবিউশন হাউস (বইবাজার), বুটিক ফ্যাশন হাউস নাগরদোলা এবং আহ্ছানিয়া-মালয়েশিয়া হজ্জ্ব মিশন চালু করেছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ‘সবার জন্য শিক্ষা’সহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছে। মিশন এ পর্যন্ত ৬৫টি আন্তর্জাতিক কর্মশালার মাধ্যমে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশের ৬৮০ জনশিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম হয়েছে।

দেশে-বিদেশে আহ্ছানিয়া মিশনের গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ মিশন জাতিসংঘ এসক্যাপ-এর হিউম্যান রিসোর্স ডেভলোপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড (১৯৯৪), ইউনেস্কোর এশিয়া প্যাসিফিক কালচারাল সেন্টার-জাপান (The Asia-Pacific Cultural Centre for UNESCO, ACCU) গ্রান্ড প্রাইজ (১৯৯৬), ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা অ্যাওয়ার্ড (২০০৩), গ্লোবাল ডেভলোপমেন্ট নেটওয়ার্ক অ্যাওয়ার্ড (২০০৩) এবং আরব গল্ফ ফান্ড ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ (২০০৪) লাভ করে। জাতীয় পর্যায়ে মিশন বাংলাদেশের সরকার কর্তৃক স্বাধীনতা পদক (২০০২) এবং ড. মুহম্মদ ইব্রাহিম স্মৃতি স্বর্ণ পদক (২০০৬) অর্জন করে।

এছাড়া মিশন নব্যসাক্ষরদের জন্য আমাদের পত্রিকা নামে একটি মাসিক দেয়াল ম্যাগাজিন, আলাপ নামে একটি মাসিক ম্যাগাজিন এবং মিশনবার্তা নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে। [কাজী রফিকুল আলম]

এ্যানথ্রাক্স(Anthrax)Bacillus Anthracis ব্যাকটেরিয়াঘটিত মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি। গ্রীক শব্দ এ্যানথ্রাক্স-এর অর্থ Coal বা কয়লা। এ রোগের কারণে শরীরে কালো রঙের ক্ষত সৃষ্টি হয় বলেই এর এই নামকরণ। বাংলায় একে তড়কা রোগ বলা হয়। এতে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, বিড়াল ইত্যাদি গৃহপালিত প্রাণি আক্রান্ত হতে পারে। এটি ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু বাহিত রোগ। এ জীবাণুর মূল উৎস মাটি। দীর্ঘদিন (অন্তত ৩/৪ দশক) রড আকৃতির এই জীবাণু স্পোর মাটিতে টিকে থাকতে পারে। গবাদিপশু বা কোনো তৃণভোজী প্রাণি মাটি থেকে ঘাস খাবার সময় সহজেই এ রোগের জীবাণু (Spore) দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগের জীবাণু সংক্রমিত পানি পান করলেও গবাদিপশু এ্যানথ্রাক্স দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। প্রাণি থেকে এ রোগ মানুষেও ছড়ায়। এটি জোনোটিক (zoonotic) রোগ। তবে মানুষ থেকে মানুষে এ রোগের বিস্তার ঘটেনা।

গবাদিপশুর একটি প্রাচীন সংক্রামক রোগ এ্যানথ্রাক্স। গবাদিপশু এ রোগে আক্রান্ত হলে গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। শরীরের তাপমাত্রা ১০৪º ফা. এর চেয়েও অধিক হয়। তাতে হঠাৎ করেই গরু পড়ে যায়। মাত্র কয়েক ঘন্টা কিংবা কয়েক দিনের মধ্যেই গরু মরে যেতে পারে। তার আগে নাক, মুখ দিয়ে কিংবা পায়খানা-প্রস্রা্বের সংগে কালো রঙের রক্ত বের হতে পারে। মৃত গরুর শরীরে দ্রুত প্রচন ধরে এবং পেট ফুলে যায়। আক্রান্তপশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মাংস কাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ এ রোগের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। মানব দেহে কাটা ছেড়ার মাধ্যমে, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে অথবা খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে এ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। পশুর হাড়চূর্ণ কিংবা চামড়া দ্বারাও এ রোগ ছড়াতে পারে। তবে দুধ থেকে এ রোগ ছড়ায় না।

মানুষের শরীরে প্রধানত ৩ ধরনের এ্যানথ্রাক্স-এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এগুলো হলো, ত্বক সংক্রান্ত এ্যানথ্রাক্স, শ্বাসজনিত এ্যানথ্রাক্স এবং পরিপাকতন্ত্রের এ্যানথ্রাক্স। সাধারণত ত্বকের এ্যানথ্রাক্স সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। তাতে হাত ও পায়ের ত্বকে কালো রঙের ক্ষত সৃষ্টি হয়। দ্রুত চিকিৎসা না নিলে তা সারা দেহেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিছুদিন পর আক্রান্ত স্থান ফুলে যায় এবং তাতে ভীষণ ব্যথা অনুভুত হয়। মানব দেহ এ্যানথ্রাক্স সংক্রমিত হলে ৮/১০ দিনের মধ্যেই তা প্রকাশ পায়। তবে চিকিৎসা নিলে তা নিরাময় হয়ে যায়।

গবাদিপশু এ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হলে এর চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয় এন্টিবায়োটিক। মাংসপেশিতে দেয়া হয় পেনিসিলিন ইনজেকশন। শিরায় ক্রিস্টালিন পেনিসিলিন ইনজেকশন দিয়েও রোগের উপশম করা যায়। ব্যথা ও জ্বর কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয় ক্লোফেনাক জাতীয় ঔষধ। আর রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হয় ভেকসিন। এর জন্য প্রাণি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পশুপাখীর যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। এ গুরুত্ব স্থূল জাতীয় আয়ে এর উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্যে, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র বিমোচনের জন্যে এবং আমিষের চাহিদা মেটানোর জন্যে। এ দেশে মানুষের ঘনত্ব যেমন বেশি, পশুপাখীর ঘনত্বও বেশি। কিন্তু উৎপাদন ক্ষমতা কম। উন্নত দেশগুলো থেকেতো বটেই, পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের চেয়েও এ দেশে পশুপাখীর উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কম। এর কারণ অনেক। একটি প্রধান কারণ হলো ঘন ঘন রোগের প্রাদুর্ভাব। আবহাওয়াগত কারণে এখানে পশুপাখীর রোগ হয় বেশি। তাতে মৃত্যুজনিত কারণে ও অসুস্থতা হেতু উৎপাদন হ্রাসের ফলে এ উপখাতের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। কারো কারো মতে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রতিবছর প্রায় ২৫ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। চলতি মূল্য প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা। গত দুবছর আগে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে দেশে যে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার ভয়ানক প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল তাতে মোট ক্ষতির পরিমান ছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১০ সালে দেখা দেয় গবাদিপশুর এ্যানথ্রাক্স রোগ। দ্রুত এ রোগটি ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তাতে এ উপখাত থেকে অর্জিত জিডিপির প্রায় তিন চতুর্থাংশ আয় ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।

এ্যানথ্রাক্স গবাদিপশুর একটি ভয়ানক রোগ। এর জীবাণু মানুষের জন্য সমরাস্ত্র হিসেবেও ব্যবহূত হয়। বিশ্বের পরাক্রমশালী দেশগুলো বিশেষ করে আমেরিকা ও রাশিয়া এ রোগের জীবাণু অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরাক যুদ্ধের সময় চিঠির এনভেলপে করে এ্যানথ্রাক্স জীবাণু প্রেরণ করা হয়েছে আমেরিকায়। তাতে অনেকে রোগাক্রান্ত হয়েছে। ধারণা করা হয়, জঙ্গীবাদের সঙ্গে যুক্ত সন্ত্রাসীরাও এ্যানথ্রাক্স ব্যবহার করতে পারে জীবাণু অস্ত্র হিসেবে।

২০১০ সালের আগস্ট মাসের মধ্যভাগে সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি ও কামারখন্দ উপজেলায় এ্যানথ্রাক্স রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায় এবং পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি জেলায় তা ছড়িয়ে পড়ে। তাতে অসংখ্য গবাদিপশু এ রোগের জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং অনেক পশু মারা যায়। অনেক মানুষের মাঝেও এ রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সারা দেশের মানুষ আতঙ্কগ্রস্তহয়। মাংসের ভোগ কমে যায়। গ্রামীণ অর্থনীতিতে দেখা দেয় এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া। শহরে কি গ্রামে কেউ গরু কিংবা ছাগল-ভেড়ার মাংস সহজে কিনতে চায়নি। দ্রুত হ্রাস পায় চামড়ার উৎপাদন। তাতে চামড়া রপ্তানি বিপুল পরিমাণে কমে যাবার আশংকা দেখা দেয়। হালাল মাংস রপ্তানিও হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হয়। সেই সঙ্গে চামড়ার জুতা, হাড়ের চূর্ণ ইত্যাদির ব্যবহার ও রপ্তানি সংকুচিত হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। ফলে নিরুৎসাহিত হয় গবাদিপশুর খামার। তাতে মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বিঘ্নিত হয়। এক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সামগ্রিকত অর্থনীতির উপর। এমতাবস্থায় যাতে রোগটি ছড়াতে না পারে তার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন পরে। মানুষকে আতংকগ্রস্ত না হয়ে এ রোগের দমন ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন হতে পরামর্শ দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে করণীয়গুলো নিম্নরূপ:

আক্রান্তপশুর মৃতদেহ, রক্ত ও মলমূত্র কমপক্ষে ৬ ফুট গভীর গর্ত করে চুন দিয়ে মাটিচাপা দিতে হবে। বর্জ্য উত্তমরুপে পরিস্কার করে ওই স্থানে চুন ছিটিয়ে দিতে হবে।
আক্রান্ত পশুকে আলাদা করে রাখতে হবে।
এ রোগের সন্ধান পেলে দ্রুত প্রাণিসম্পদ অফিসকে খবর দিতে হবে এবং আক্রান্তপশুর চিকিৎসা করতে হবে।
সুস্থ গবাদিপশুকে এ্যানথ্রাক্স রোগের টিকা দিতে হবে।
আক্রান্ত এলাকায় পশুর চালাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সংক্রামিত এলাকায় পশুচারণ বন্ধ করতে হবে এবং ওই এলাকা থেকে ঘাস কেটে গরুকে খাওয়ানো বারণ করতে হবে।
গবাদিপশু জবাই, মাংস কাটা ও রান্নার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মুখে মাক্স ও হাতে গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে।
উচ্চ তাপমাত্রায় বিশেষ করে প্রেসার কুকারে ভালভাবে মাংস রান্না করে খেতে হবে।
মানুষের এ রোগ হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসায় এ রোগ নিরাময় হয়।
মানব কল্যাণের লক্ষ্যে এ রোগের উৎপত্তি, বিস্তার এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তশৃঙ্খলা ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার কাজ সম্পন্ন করা দরকার এবং জনস্বার্থে তা সবাইকে অবহিত করা উচিৎ। দু’বছর আগে ২০০৮ সালে এ ধরণের একটি গবেষণার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার ওপর। দেশের ৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে ১৭জন গবেষক এ কাজে অংশ নেন। অতি অল্প খরচে মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই গবেষণার কাজটি সম্পন্ন হয়। দেশে ও বিদেশে ওই কাজটি বেশ সমাদৃত হয়। এটি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে সাভারস্থ বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে। বিভিন্ন জার্নালেও প্রকাশিত হয়েছে এর সারসংক্ষেপ। তা অনুসরণ করা যেতে পারে।
[জাহাঙ্গীর আলম]

এইডস (Acquired Immune Deficiency Syndrome/AIDS) এইচআইভি (Human Immuno-deficiency Virus/HIV) নামক ভাইরাস সংক্রমণের কারণে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, লোপ বা ধ্বংস অবস্থা। ১৯৮১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লসএঞ্জেলস-এ সর্বপ্রথম এইডস শনাক্ত করা হয়। এশিয়ার মধ্যে থাইল্যান্ডে ১৯৮৪ সালে প্রথম এইডস লক্ষ্য করা যায় এবং মায়ানমার ও ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯৮৬ সালের মধ্যেই এর প্রাদুর্ভাব ঘটে।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এইডস শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। ১৯৯৮ সালের জুন পর্যন্ত ১০২ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগীর মধ্যে ১০ জনের এইডস ধরা পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ৪,০০০ লোকের মধ্যে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, বাংলাদেশ এইডস মহামারীর দ্বারপ্রান্তে উপনীত। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি) এবং জাতীয় এইডস নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন মাদকদ্রব্য গ্রহণকারীর মধ্যে অন্তত দুই জন এইচআইভি ভাইরাসের বাহক যা এইডস রোগ ঘটায়। এছাড়াও প্রতি একশত যৌনকর্মীর মধ্যে অন্তত একজনের এইচআইভি আছে। এইচআইভি-র বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা কিভাবে গড়ে তোলা যায় এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা না থাকার কারণেই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এছাড়া অপ্রতুল স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং একাধিক মাদকাসক্ত ব্যক্তির একই সুচ ব্যবহারও এর বড় কারণ। আশঙ্কা করা যাচ্ছে, আফ্রিকান দেশগুলির মতো এদেশকেও এইডস-এর বিস্তৃতি দ্রুত গ্রাস করবে, যদি সময়োচিত ও সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে এই প্রবণতা রোধ করা না যায়। এইডস-এর প্রাথমিক অবস্থায় বেশিরভাগ (৬০%) রোগী লক্ষণ শূন্য থাকে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, ওজন হ্রাস, দীর্ঘস্থায়ী উদরাময়, লসিকা গ্রন্থির বৃদ্ধি, ক্ষত সারাতে দীর্ঘসময়ক্ষেপন, সাধারণত সংক্রমণশীল নয় এমন অণুজীব এর সংক্রমণ, অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্য্যতা ইত্যাদি এইডস রোগের লক্ষণ।

এইচআইভি ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়তে ৩ থেকে ৬ মাস সময় নেয়। কোনো কোন ক্ষেত্রে রোগী কোনো রোগ লক্ষণের প্রকাশ ছাড়াই ১৫ বছর পর্যন্ত বাহক পর্যায়ে থেকে যেতে পারে। বাহকদের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে ৮ বছর এবং ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে ১৫ বছর পর এইডস রোগ বিকশিত হয়। রোগ একবার বিকশিত হলে আর চিকিৎসা করে নিরাময় করা যায় না। উন্নত দেশগুলিতে এইডস নিয়ে লোকে তিন বছর এবং উন্নয়নশীল দেশে এক বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে দেখা যায়। সংক্রামিত রোগীর রক্ত, বীর্য ও যোনি রসের সঙ্গে যদি অন্যলোকের রক্ত, শরীর রস বা মিউকাস আবরণের সংস্পর্শ ঘটে তাহলে এইচআইভি ভাইরাস বিস্তার লাভ করে। রোগ সঞ্চারের পদ্ধতির মধ্যে যৌনসহবাস ও দূষিত রক্ত গ্রহণ অন্যতম। সংক্রমিত মা থেকে শিশুর দেহে গর্ভাবস্থায় বা প্রসবকালে এমনকি জন্মের পর সন্তান পালনকালেও মাতৃ দুগ্ধের মাধ্যমে এইডস ছড়াতে পারে। এইডস রোগীর আস্ত্রোপচারকালিন অসাবধানতার কারণে সূঁচ ফোটানর মাধ্যমে সার্জনও এইডস রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। একসাথে চলাফেরা, উঠাবসায় ও করমর্দনের মাধ্যমে এইডস ছড়ায় না।

দ্রুতবিস্তার বিশেষ করে আফ্রিকায় এর ভয়াবহতার কারণে এইডস বিশবব্যাপী সর্বাধিক আলোচিত স্তাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০০৭ সালে পৃথিবীতে এইডস রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৩.২ মিলিয়ন, আর মারা যায় ২.১ মিলিয়ন যাদের মধ্যে ৩,৩০,০০০ জন ছিল নিরপরাধ শিশু। বাংলাদেশী জনগণের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এইডস বিস্তার রোধের সহায়ক। তথাপি পার্শববর্তী দেশে অধিকসংখ্যায় এইচআইভি পজিটিভ যৌনকর্মী, চাকুরি, ব্যাবসা-বাণিজ্য উপলক্ষ্যে ও পর্যটনেশিল্পের বিকাশের কারণে লোকজনের দেশের বাহিরে গমন ও প্রত্যাবর্তন, যৌনকর্মীদের স্তাস্থ্যপরীক্ষার বাধ্যবাধকতার অভাব, সুঁচ ব্যবহারকারী মাদকাসক্ত, অননুমোদিত ব্লাড ব্যাংক প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশ এইডস মহামারীর ঝুকিতে রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা আর ইতিমধ্যে এইডস রোগীর সংখ্যাও (UNAIDS এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৭ সালে এইচআইভি পজিটিভ ১৩০০০ জন ) বৃদ্ধি পেয়েছে। এইডস এর টিকা ও এইডস সারানোর ঔষধ এখনও আবিস্কৃত হয়নি তবে দামী ঔষধ প্রয়োগে এইডস রোগীদের অবস্থার অবনতি বিলম্বিত করা যাচ্ছে। প্রতিরোধ ও বিস্তাররোধে সরকার ও অন্যান্য সংস্থা 'এইডস কী-বাঁচতে হলে জানতে হবে ' শ্লোগানসহকারে গণপ্রচারমাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনা বৃদ্ধির ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে।
[মোঃ শহীদুল্লাহ ও এম.কে.আই কাইয়ুম চৌধুরী]

চর্যাপদঃ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে এর পুথি আবিষ্কার করেন। তাঁরই সম্পাদনায় ৪৭টি পদবিশিষ্ট পুথিখানি হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা (১৯১৬) নামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক প্রকাশিত হয়। তিনি পুথির সূচনায় একটি সংস্কৃত শ্লোক থেকে নামের যে ইঙ্গিত পান তাতে এটি চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয় নামেও পরিচিত হয়। তবে সংক্ষেপে এটি ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ বা ‘চর্যাপদ’ নামেই অভিহিত হয়ে থাকে।
চর্যাপদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর এর বিষয়, ভাষা ও কাল সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা হয়। এতে তেইশজন পদকর্তার ৪৭টি পদ আছে। চর্যার কবিদের কাল খ্রিস্টীয় নবম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে ধরা হয়। অবশ্য মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতে চর্যার কোনো কোনো পদকর্তার আবির্ভাবকাল সপ্তম অথবা অষ্টম শতক। চর্যাকাররা সহজযান ধর্মমতে দীক্ষিত ও সিদ্ধাচার্য নামে পরিচিত ছিলেন। তান্ত্রিক যোগসাধনা তাঁদের ধর্মমতের বৈশিষ্ট্য। চর্যাপদে এ সাধনার কথা হেঁয়ালিপূর্ণ ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে। ফলে দেশজ ভাষায় রচিত হলেও চর্যাপদের মূল ভাবের মর্মোদ্ঘাটন দুরূহ ব্যাপার। এ কারণে পন্ডিতগণ এ ভাষাকে ‘আলো-অাঁধারি’ বা সন্ধ্যা ভাষা নামে অভিহিত করেন।

চর্যাপদের ভাষা অবিমিশ্র বাংলা নয়, কারণ চর্যার কবিগণ ছিলেন বিভিন্ন অঞ্চলের (যথা বাংলা, উড়িষ্যা, আসাম, বিহার)। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমা তখন নানাদিকে প্রসারিত ছিল। সেজন্য উড়িষ্যা, আসাম এমনকি বিহারের ভাষাদর্শও চর্যাপদে লক্ষ্য করা যায়। ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায় বাংলা, অসমিয়া ও উড়িয়া ভাষা পূর্ব ভারতের একই মূল কথ্য ভাষা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। তাই বাঙালি, অসমিয়া ও উড়িষ্যাবাসী প্রত্যেকেই চর্যাপদের দাবিদার। তবে ‘বঙ্গাল দেশ’, ‘পঁউয়া খাল’ (পদ্মানদী), ‘বঙ্গালী ভইলি’ ইত্যাদির উল্লেখ থাকায় বাঙালির দাবি অগ্রগণ্যরূপে বিবেচিত হয়।

চর্যাপদের কবিরা হলেন সরহপা, শবরপা, লুইপা, ডোম্বীপা, ভুসুকুপা, কাহ্নপা, কুক্কুরীপা, মীনপা, আর্যদেব, ঢেণ্ঢনপা প্রমুখ। চর্যাপদে তত্ত্বের কথা থাকলেও এর সাহিত্যমূল্যও স্বীকৃত। কবিরা যুক্তিবাদী ও মননধর্মী হয়েও উপমা-রূপকের ব্যবহারে দক্ষ ছিলেন। তাঁদের রচনাশৈলী শিল্পসৌকর্যের অভিমুখী। তাঁদের বাকরীতি সংক্ষিপ্ত, অথচ নিগূঢ় অর্থবাহী। কোনো কোনো পদের এ অর্থগূঢ় বাক্যে সাধনমার্গে পৌঁছাবার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যেমন ডোম্বীপার ১৪নং পদ: ‘বাহতু ডোম্বী বাহ লো ডোম্বী বাটত ভইল উছারা। সদ্গুরু পাঅ পসাএ জাইব পুণু জিনউরা\’ অর্থাৎ, ডোমনি নদী পারাপার করছে, আর তারই মাধ্যমে সহজ সাধনার তীর্থধামে পৌঁছানোর আভাস সূচিত হচ্ছে।

চর্যাপদ শুধু প্রাচীন বাংলা সাহিত্যেরই নিদর্শন নয়, প্রাচীন বাংলা গানেরও নিদর্শন। প্রতিটি পদের শুরুতে রাগ-তাল ও প্রতি জোড়-পদে ‘ধ্রুব’ শব্দের উল্লেখ থাকায় নিশ্চিত প্রমাণিত হয় যে, এগুলি তখন গাওয়া হতো। এ ছাড়া পদগুলি থেকে তৎকালীন বাঙালি জীবনের আচার-আচরণ ও সমাজের বাস্তবঘন পরিচয়ও পাওয়া যায়। যেমন তখনকার মানুষ হরিণ শিকার, নৌকা চালনা, চেঙারি তৈরি, শুঁড়ির কাজ ইত্যাদি করত। কাড়া-নাকাড়া ও ঢাক-ঢোল বাজিয়ে বর-কনেকে বিয়ের আসরে নিয়ে যাওয়া হতো। সমাজে যৌতুক প্রথা প্রচলিত ছিল। গরু ছিল গৃহপালিত পশু; হাতিরও উল্লেখ আছে। মেয়েরা পরিধানে ময়ূরপুচ্ছ, গলায় গুঞ্জার মালা এবং কর্ণে কুন্ডল পরত। টাঙ্গি, কুঠার, নখলি বা খন্তা ছিল উল্লেখযোগ্য অস্ত্র। তবে সমকালীন সমাজের এসব চিত্র অঙ্কন করলেও চর্যাকারেরা প্রধানত ছিলেন বৈরাগ্যপন্থি, জগৎমুখী নন।[আজহার ইসলাম]

হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী, (১৮৯২-১৯৬৩) রাজনীতিক, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৮৯২ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সোহ্‌রাওয়ার্দী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি (সম্মান) ও বি.সি.এল ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরে লন্ডনের গ্রেইজ ইন থেকে ব্যরিস্টার-এট-ল সম্পন্ন করেন। ১৯২০ সালে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে ফিরেই তিনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন।
হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী ১৯২১ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভা এবং পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকেছেন। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯২৪ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়র, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনোত্তর ফজলুল হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার শ্রম ও বাণিজ্য মন্ত্রী, ১৯৪৩-১৯৪৫ সালে খাজা নাজিমউদ্দীন মন্ত্রিসভায় বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী, ১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪-৫৫ সালে মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী এবং ১৯৫৬-১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

সোহ্‌রাওয়ার্দী ছিলেন এক প্রতিভাবান রাজনৈতিক সংগঠক। বিশ শতকের বিশের দশকে কলকাতা খেলাফত কমিটির সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে তিনি প্রথম তাঁর যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। একজন শ্রমিকনেতা হিসেবে কলকাতায় রাজনৈতিক কর্মজীবন শুরু করে তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যে নাবিক, রেলকর্মচারী, পাটকল ও সুতাকল কর্মচারী, রিক্সাচালক, গাড়িচালক প্রভৃতি মেহনতি মানুষের প্রায় ৩৬টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তোলেন।

১৯২৬ সালে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৯ সালে পরবর্তী অ্যাসেম্বলি নির্বাচনের সময় তিনি বেঙ্গল মুসলিম ইলেকশন বোর্ড নামে অপর একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পূর্বে সোহ্‌রাওয়ার্দী কলকাতায় ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন এবং নিজে এই দলের সম্পাদক হন। আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ভারতের মুসলমানদের একটি সর্বভারতীয় সংগঠন হিসেবে মুসলিম লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সোহ্‌রাওয়ার্দী জিন্নাহর আহবানে সাড়া দিয়ে নিজের নবগঠিত দল নিয়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন। প্রধানত সোহ্‌রাওয়ার্দীর সাংগঠনিক শক্তির সুবাদেই মুসলিম লীগ ভারতের সর্বমোট ১১ প্রদেশের মধ্যে কেবল বাংলায় সাফল্য অর্জন করে। ১২১ টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩৯টি আসন পায় মুসলিম লীগ এবং ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক-প্রজা পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠনে সমর্থ হয়। ১৯৩৭-৪৩ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে সোহ্‌রাওয়ার্দী সমগ্র প্রদেশে দলকে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন বাংলায় মুসলিম লীগের স্থপতি। হক-বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে তথাকথিত শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার (১৯৪১-১৯৪৩) পতন ঘটানোর ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন মূল শক্তি। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগের বিস্ময়কর বিজয়ের রূপকারও ছিলেন তিনি। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগ ১২১টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে জিতেছিল ১১৪টি আসনে। এ বিজয়কে অনেকেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে মুসলমানদের রায় বলে মনে করেন, আর এই বিচারে সোহ্‌রাওয়ার্দীও ছিলেন জিন্নাহ্র সঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম স্রষ্টা।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম ও প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সোহ্‌রাওয়ার্দীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ দল গঠনে তিনি কলকাতা থেকে তাঁর পূর্ববঙ্গীয় সমর্থকদের পরামর্শ ও সাহস যুগিয়েছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৭ বছরের মধ্যে ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ যুক্তফ্রন্টের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রাদেশিক পরিষদের সর্বমোট ৩০৯ আসনের মধ্যে মাত্র ৯ আসন লাভ করে। নির্বাচনের এই ফলাফলেও সোহ্‌রাওয়ার্দীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এন.ডি.এফ) গঠন করে তিনি ১৯৬২-৬৩ সালের আইয়ুব-বিরোধী সম্মিলিত জোটের আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

বিভাগপূর্বকালে সোহ্‌রাওয়ার্দী মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষায় বরাবরই তৎপর ছিলেন। ১৯৩২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকে তিনি মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি তাদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থারও অটল সমর্থক ছিলেন। জিন্নাহর উদ্যোগে ১৯৪৬ সালের ৭-৯ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম আইন প্রণেতাদের কনভেনশনে গৃহীত আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রস্তাবকও ছিলেন তিনি। সোহরাওয়ার্দী বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে পাকিস্তানের দাবিতে মুসলিম লীগ কর্তৃক প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস (১৬ আগস্ট ১৯৪৬) পালনকালে কলকাতায় ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ হিসেবে পরিচিত এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়।

ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের প্রাক্কালে সোহ্‌রাওয়ার্দী সমগ্র বাংলা, আসাম ও বিহারের মানভূম, সিংভূম ও সম্ভবত পূণির্য়া জেলা সমন্বয়ে পূর্বভারতে ‘বৃহৎ বাংলা’ নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। একথা সর্ববিদিত যে, ভারত বিভাগের প্রাক্কালে বাংলা প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সোহ্‌রাওয়ার্দী শরৎচন্দ্র বসু, কিরণ শংকর রায়, সত্যরঞ্জন বক্শি প্রমুখ হিন্দু নেতাদের সহযোগে ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি অখন্ড স্বাধীন বাংলা নামে তৃতীয় একটি ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক আবুল হাশিম এতে সর্বাত্মক সমর্থন যুগিয়েছিলেন। এ প্রয়াস সফল হয় নি।

দেশবিভাগের পর অন্যদের সঙ্গে সোহ্‌রাওয়ার্দী তখনই পাকিস্তানে আসেন নি। তিনি কলকাতায় থেকে যান এবং গান্ধীর সঙ্গে শান্তি মিশনের কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন। অপরদিকে, মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক তথা নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের কর্ণধারদের সঙ্গে কখনোই তাঁর সুসম্পর্ক ছিল না। সে কারণে ১৯৪৯ সালে সোহ্‌রাওয়ার্দী পাকিস্তানের স্থায়ী বাসিন্দা নন এ অজুহাতে লিয়াকত আলী খানের সরকার পাকিস্তানের গণপরিষদ থেকে সোহ্‌রাওয়ার্দীর সদস্য পদ খারিজ করে দেয়।

ভারত ও বাংলা বিভাগের পর সার্বিকভাবেই একটি ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সোহ্‌রাওয়ার্দীর দৃষ্টিতে অতঃপর পূর্ববাংলার স্বাধীন অস্তিত্বের আর কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি সম্মিলিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় সমঅধিকার ও ক্ষমতার সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাঙালি ও অবাঙালি সমস্যার সমাধানের পথকেই যথার্থ বলে ভেবেছিলেন। তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সমতার নীতি এবং পশ্চিম পাকিস্তান এক ইউনিট গঠনের একান্ত সমর্থক ছিলেন।

সোহ্‌রাওয়ার্দী সাংবিধানিক শাসনে দৃঢ়বিশ্বাসী ছিলেন; আর এ কারণেই তিনি ১৯৫৪ সালে দলীয় আপত্তি উপেক্ষা করে মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। তিনি পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আইনমন্ত্রী থাকাকালে সোহ্‌রাওয়ার্দীর বলিষ্ঠ ও উদ্যোগী ভূমিকার সুবাদেই পাকিস্তানের দুই অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ১৯৫৫ সালে মারী চুক্তি সম্ভব হয় এবং এই চুক্তি পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নের পথ সুগম করে।

সোহ্‌রাওয়ার্দী একজন বাস্তববাদী রাজনীতিক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। বিভাগপূর্ব কালে বাংলার মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার কারণে তিনি তাদের জন্য পৃথক নির্বাচনের একজন গোঁড়া সমর্থক ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি সাধারণ জাতীয়তা গড়ে তোলার জন্য যৌথ নির্বাচনের পক্ষে মত দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এ সংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়। সোহ্‌রাওয়ার্দী ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। [হারুন-অর-রশিদ]

সেন্ট মার্টিনস দ্বীপঃ- বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ অংশে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলা থেকে ৯ কিমি দক্ষিণে গড়ে ওঠা একটি ছোট দ্বীপ। মায়ানমারের উত্তর-পশ্চিম উপকূল থেকে ৮ কিমি পশ্চিমে নাফ নদীর মুখে দ্বীপটি অবস্থিত। ৯২°১৮´ ও ৯২°২১´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২০°৩৪´ ও ২০°৩৯´ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে দ্বীপটির অবস্থান। স্থানীয় জনসাধারণ এটিকে নারিকেল জিনজিরা নামে চেনে। সর্বতোভাবে দ্বীপটি সমতল এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা থেকে ৩.৬ মিটার উপরে। মূল ভূখন্ড এবং দ্বীপের মধ্যবর্তী ৯.৬৬ কিমি প্রশস্ত প্রণালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমের উন্মুক্ত সাগরের তুলনায় অনেক অগভীর। এখানে পশ্চিম-উত্তর পশ্চিম দিক জুড়ে রয়েছে ১০-১৫ কিমি প্রবাল প্রাচীর। দ্বীপটি ৭.৩১৫ কিমি দীর্ঘ এবং উত্তর-উত্তরপশ্চিম এবং দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব দিক জুড়ে বিন্যস্ত। ভৌগোলিকভাবে এটি তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তরাঞ্চলীয় অংশকে বলা হয় নারিকেল জিনজিরা বা উত্তর পাড়া এবং এ অংশ ২,১৩৪ মিটার দীর্ঘ ও ১,৪০২ মিটার প্রশস্ত। দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশটি দক্ষিণ পাড়া হিসেবে পরিচিত, যা ১৯২৯ মিটার দীর্ঘ এবং এর সাথে সংযুক্ত রয়েছে দক্ষিণ পূর্ব দিকে বিস্তৃত একটি সংকীর্ণ লেজের মতো এলাকা, যার সর্বোচ্চ প্রশস্ততা ৯৭৫ মিটার। একটি সংকীর্ণ কেন্দ্রীয় অঞ্চল বা মধ্য পাড়া দুইটি অংশকে সংযুক্ত করেছে। বেল্ট বা ফিতার মতো এই অঞ্চলটির দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ যথাক্রমে ১৫২৪ মিটার ও ৫১৮ মিটার এবং সংকীর্ণতম অংশটি গলাচিপা নামে পরিচিত। মূল দ্বীপ ছাড়াও এখানে কয়েকটি ১০০ থেকে ৫০০ বর্গ মিটার আয়তন বিশিষ্ট ক্ষুদ্র দ্বীপ রয়েছে, যেগুলোকে স্থানীয়ভাবে ছেড়াদিয়া বা সিরাদিয়া নামে অভিহিত করা হয়, যার অর্থ বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। উত্তর পাড়ার মাঝামাঝি অঞ্চলে একটি অগভীর উপহ্রদ (lagoon) রয়েছে এবং জোয়ারের সময় পশ্চিম তীরের একটি সংকীর্ণ নদীখাতের মাধ্যমে এটির সাথে সমুদ্রের সংযোগ ঘটে। উত্তর পাড়ার পৃষ্ঠমৃত্তিকা গঠিত হয়েছে বালি এবং ঝিনুক শামুকের খোলস সহযোগে। দক্ষিণ পাড়া অঞ্চলে রয়েছে দুটি ক্ষুদ্র মৃত উপহ্রদ এবং একটি বিস্তৃত জলাভূমি। মাছ সংগ্রহস্থল, বাজার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ শুধুমাত্র উত্তর পাড়াতেই অবস্থিত।

টেকনাফ এবং সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের মধ্যে নিয়মিত লঞ্চ ও দেশী নৌকা চলাচল করে। দ্বীপের অধিবাসীর সংখ্যা ৩৭০০ এবং এদের অধিকাংশই মৎস্যজীবী। এই মৎস্যজীবী পরিবারের সংখ্যা ৫৩৫। দ্বীপে ১৮২টি বন্য জীব প্রজাতির অস্তিত্ব চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৪টি প্রজাতি উভচর গোত্রের, ২৮টি সরীসৃপ, ১৩০টি পাখি এবং স্তন্যপায়ীর সংখ্যা ২০। দ্বীপের উত্তরাংশে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাস পর্যটন কাল। দ্বীপের সর্বাপেক্ষা ঘনবসতি পূর্ণ অংশ হল জিনজিরা। সমস্ত দ্বীপে স্বাদু পানির অভাব রয়েছে। শুধুমাত্র অল্প কিছু পুকুর এবং কিছু সংখ্যক নলকূপের মাধ্যমে সমগ্র দ্বীপে পানীয় জল এবং চাষাবাদের জন্য স্বাদু পানি সরবরাহ করা হয়।

যদিও দ্বীপটি মৌসুমি বায়ু অঞ্চলের আওতায় পড়েছে, তথাপি এখানকার জলবায়ু সমুদ্র দ্বারা অধিক মাত্রায় প্রভাবিত। প্রধান গাছপালার মধ্যে রয়েছে নারিকেল, সুপারি এবং বাঁশ। দ্বীপজুড়ে রয়েছে প্রচুর নারিকেল গাছ এবং জিনজিরা এলাকায় এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। দ্বীপের মৃত্তিকা খুব একটা উর্বর নয়। প্রধান ফসল পিঁয়াজ, তরমুজ এবং কিছু পরিমাণ ধান।
দ্বীপটির ভূতাত্ত্বিক গঠন খুবই সাধারণ এবং একটি উত্থিত উত্তলভঙ্গ (anticline) দ্বারা নির্দেশিত। দক্ষিণপাড়ার পশ্চিম তীর জুড়ে উত্তলভঙ্গ অক্ষের সামান্য চিহ্নিত করা যায়। অক্ষের প্রকটিত অংশ উত্তর-উত্তরপশ্চিম থেকে দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব দিকে প্রসারিত, প্রায় দ্বীপের সঙ্গে সমান্তরাল। উত্তর-পশ্চিম উপকূল রেখা জুড়ে অক্ষের প্রায় সমান্তরাল চ্যুতি রয়েছে। সেন্ট মার্টিনস চুনাপাথর, ঝিনুক-শামুকের খোলস সৃষ্ট কোকুইনা স্তর এবং প্রবালগুচ্ছ (প্রবাল সৃষ্ট চুনাপাথর) দ্বারা গঠিত। অত্যন্ত প্রবেশ্য (permeable) এবং রন্ধ্রযুক্ত (porous) হওয়ার জন্য ঝিনুক-শামুকের খোলস সৃষ্ট চুনাপাথর যেখানে পলল স্তরের নিচে সঞ্চিত হয় সেখানে একটি ভূগর্ভস্থ জলস্তরের (aquifer) সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক (Recent) সামুদ্রিক বালি এবং ঝিনুক-শামুকের খোলস সৃষ্ট চুনাপাথর স্বাদু পানির প্রধান উৎস।

সমস্ত দ্বীপ জুড়ে ভাটার পানি স্তরের অত্যন্ত কাছাকাছি ক্ষুদ্র খাড়িসমূহে বিভিন্ন ধরনের জীবিত ছোট ছোট প্রবাল গোষ্ঠী দেখা যায়। দ্বীপের চারপাশে অগভীর সমুদ্রেও এদের দেখা যায়। প্রধানত সৈকত শিলা (beach rock) জমে থাকা পাথরে এবং চুনযুক্ত বেলেপাথরে বেড়ে ওঠে। মৃত প্রবাল গোষ্ঠীগুলি ক্ষুদ্র জলমগ্ন নিম্নভূমিতে জোয়ারভাটা উভয় সময়েই দেখা যায়। এদের কিছু কিছু ভাটার সময়ের পানি স্তরের চেয়ে প্রায় ৩.৫০ মিটার উপরেও পরিদৃষ্ট হয়। সর্বাপেক্ষা প্রাচীন প্রবাল জীবাশ্মটি নবীন প­াইসটোসিন যুগের শেষ পর্যায়ের, এর বয়স ৩৩.২৩৮ বৎসর (c14 dating)। দ্বীপটিতে হলোসিন যুগের উত্থানের পরিষ্কার চিহ্নটি হলো দক্ষিণ পাড়া সমুদ্রতীরে ৩.০ মিটার কোকুইনা চুনাপাথরের উচ্চভূমির আবির্ভাব। এই চুনাপাথর স্তরের নিম্ন অংশের বয়স ৪৫০ বৎসর এবং উপরের অংশের ২৯২ বৎসর। এই তথ্য থেকে দেখা যায় দ্বীপের গড় উত্থানের হার বছরে ১৯.০ মিমি। কোকুইনা স্তরটি বর্তমান জোয়ারকালীন পানির স্তরের চেয়ে ১.৫ মিটার উপরে এবং পূর্বাঞ্চলীয় চ্যুতি স্তূপের ঊর্ধ্বক্ষিপ্ত অংশে অবস্থান করে।
উত্থিত মৃত প্রবালসমূহের মধ্যে বিশেষ করে পোরাইটিস (Porites) প্রজাতি, একরোপোরা (Acropora) প্রজাতি, সাইপোসট্রিয়া (Cyphostrea) এবং পে­টিজেরিন (platygyrn) প্রজাতিগুলি আরও নিচের স্তরে আবির্ভূত হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে। অর্থাৎ এরা সেই স্তরের আরও উপরে উঠে এসেছে যেখানে বর্তমানে তারা অবস্থান করছে। উত্থিত মৃত প্রবালগুলির রেডিওকার্বন ডেটিং এই অবস্থা প্রমাণ করে যে মৃত প্রবালগুলির উত্থান খুবই সাম্প্রতিক সময়ে, প্রকৃতপক্ষে এগুলো এখনো বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছে। এই বাস্তবতা নির্দেশ করছে যে, সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের উত্থান হচ্ছে; ফলে এর পরিবেশ এখন দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ হিসেবে এর বৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনুকূল নয়। দেশের এই একমাত্র প্রবাল দ্বীপটির উত্থানের শুরু হয়েছিল কমপক্ষে গত সর্বোচ্চ হিমবাহ যুগ থেকে (অর্থাৎ আনুমানিক 40,000 বৎসর পূর্বে)। [সিফাতুল কাদের চৌধুরী]

বখতিয়ার খলজীঃ- ১২০৫ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে নদীয়া জয় করেন এবং বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেন। উত্তর আফগানিস্তানের গরমশির (আধুনিক দস্ত-ই-মার্গ) এলাকার বাসিন্দা ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী তুর্কি জাতির খলজী সম্প্রদায়র্ভুক্ত ছিলেন। গজনীতে তিনি তাঁকে সৈনিক হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য মুহম্মদ ঘুরীর নিকট আবেদন করেন। কিন্তু খর্বাকৃতি ও বাহুদ্বয় হাঁটুর নিচ পর্যন্ত লম্বা হওয়ার কারণে তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। ভগ্নমনোরথ হয়ে বখতিয়ার অতঃপর দিল্লির দিকে অগ্রসর হন এবং কুতুবউদ্দীন আইবকের অধীনে চাকরি প্রার্থী হন। কিন্তু সেখানেও তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো না। এরপর তিনি বদাউনে যান এবং সেখানে তিনি মালিক হিজবরউদ্দীন কর্তৃক একটি নিম্নপদে নিযুক্ত হন। অল্পকাল পরেই তিনি বদাউন পরিত্যাগ করে অযোধ্যায় উপস্থিত হন। বাদাউনের শাসনকর্তা মালিক হুসামউদ্দীনের অধীনে তিনি মির্জাপুর জেলার ভাগওয়াত ও ভিউলী নামে দুটি পরগণার জায়গির প্রাপ্ত হন এবং মুসলমান রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে সীমান্ত রক্ষীর কাজে নিয়োজিত হন। এখান থেকেই বখতিয়ার খলজী তাঁর ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টায় সফল হন। তিনি সীমন্তবর্তী ছোট ছোট হিন্দু রাজ্য আক্রমণ করে সম্পদ বৃদ্ধি করেন এবং খলজী সম্প্রদায়ের অন্যান্য লোক তাঁর দলভূক্ত হলে সৈন্যসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।

১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজী বিহার আক্রমণ করেন এবং তাঁর সৈন্যদল বৌদ্ধদের শিক্ষাকেন্দ্র ওদন্তপুরী বৌদ্ধবিহারটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে। অতঃপর তারা সে স্থান থেকে মূল্যবান সম্পদ লুণ্ঠন করে প্রত্যাবর্তন করে। তিনি কুতুবউদ্দীন আইবকের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে মূল্যবান উপহার প্রদান করেন। অপরপক্ষে কুতুবউদ্দীনও তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। অতঃপর ১২০৪ খ্রিস্টাব্দের শীতকালে তিনি ঝাড়খন্ডের দুর্গম অরণ্যাঞ্চলের মধ্য দিয়ে লক্ষ্মণসেন এর অবকাসকালীন রাজধানী নদীয়া আক্রমন করেন। বলা হয়ে থাকে যে, মাত্র সতের জন ঘোড় সওয়ার সৈন্য লক্ষণসেনের সঙ্গে নগরে প্রবেশ করেছিল। নগরবাসীরা তাঁকে ঘোড়া ব্যবসায়ী বলে মনে করেছিল এবং সে কারণেই বখতিয়ার খলজী অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে সহজেই রাজপ্রাসাদ দখল করতে পেরেছিলেন। রাজা লক্ষ্মণসেন নৌপথে তাঁর রাজধানী বিক্রমপুরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইতোমধ্যে বখতিয়ার খলজীর মূল বাহিনীও এসে পড়েছিল। ফলে নদীয়া মুসলমানদের অধিকারে আসে।

বখতিয়ার খলজী স্বল্প সময়ের জন্য নদীয়ায় অবস্থান করেন এবং পরে তিনি গৌড়ের দিকে যাত্রা করেন। তিনি ৬০১ হিজরিতে (১২০৫ খ্রি.) বিনা বাধায় গৌড় জয় করেন এবং লখনৌতি নাম দিয়ে সেখানে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন। পূর্বে গৌড়ের নাম ছিল লক্ষণাবতী। বখতিয়ার খলজীর রাজ্য উত্তরে বর্তমান পূর্ণিয়া শহর থেকে দেবকোট (দিনাজপুর) জেলা হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে সোজাসুজিভাবে রংপুর শহর পর্যন্ত, দক্ষিণে পদ্মা নদী, পূর্বে তিস্তা ও করতোয়া নদী এবং পশ্চিমে তাঁর পূর্ব অধিকৃত বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

বখতিয়ার খলজীর জীবনের শেষ উল্লেখযোগ্য কাজ তিববত অভিযান। তিনি লোক মারফত তিববতে যাওয়ার পথ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করেন। আলী মেচ নামের মেচ উপজাতির এক ব্যক্তি পার্বত্য এলাকার মধ্য দিয়ে বখতিয়ার খলজীর পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। তিববত অভিযান পরিচালনা করার পূর্বে বখতিয়ার খলজী তাঁর রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে এবং রাজ্যের প্রতিরক্ষাকল্পে প্রয়োজনানুরূপ ব্যবস্থাদি গ্রহণ করেন। তিনি তিনটি সীমান্ত প্রশাসকের পদ সৃষ্টি করেন এবং শিরাণ খলজী, আলী মর্দান খলজী এবং হুসামউদ্দীন ইওজ খলজীকে যথাক্রমে লখনৌর, ঘোড়াঘাট ও তান্ডায় নিযুক্ত করেন।

বখতিয়ার খলজী দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে ৬০২ হিজরির (১২০৬ খ্রি.) প্রথম দিকে দেবকোট হতে বেগমতী নদী বরাবর যাত্রা করেন। তিনি প্রাচীন একটি সেতুর মাধ্যমে নদী অতিক্রম করে পার্বত্য এলাকার দিকে অগ্রসর হন। সেখানে স্থানীয় লোকদের সাথে তাঁর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে তিনি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং অবশেষে প্রত্যাবর্তন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর প্রত্যাগমন ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি একশত জনের কিছু বেশি সংখ্যক সহচর নিয়ে দেবকোটে পৌঁছেন। দেবকোটে বখতিয়ার খলজী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অসুস্থ অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মিনহাজ ই সিরাজের বর্ণনানুসারে, তিনি আলী মর্দান খলজী কর্তৃক ছুরিকাঘাতে ৬০২ হিজরিতে (১২০৬ খ্রি.) নিহত হন।

বখতিয়ার খলজী একজন সুশাসক ছিলেন। তিনি তাঁর রাজ্যকে কয়েকটি জেলায় বিভক্ত করেন এবং সেগুলির শাসনভার তাঁর প্রধান অমাত্য ও সামরিক প্রধানদের ওপর ন্যস্ত করেন। তাঁদেরকে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা, রাজস্ব আদায় করা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং জনগণের পার্থিব ও নৈতিক উন্নতির দিকে লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি লখনৌতিতে রাজধানী স্থাপনের পর খুৎবা পাঠ করেন এবং দিল্লীর সুলতান মোহাম্মদ ঘুরীর নামে মুদ্রা প্রবর্তন করেন। তিনি দিনাজপুর ও রংপুরের নিকট দুটি ছাউনি শহর নির্মাণ করেন। তাঁর সময়ে প্রচলিত প্রশাসনিক বিভাগকে ইকতা এবং এর শাসনকর্তাকে মুকতা বলা হতো। তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন। [এ.বি.এম শামসুদ্দীন আহমদ]

ষাটগম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলির মধ্যে বৃহত্তম এবং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম চিত্তাকর্ষক নিদর্শন। খান আল-আজম উলুগ খান জাহান, যিনি দক্ষিণ বাংলার এক বৃহৎ অংশ জয় করে তৎকালীন সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-৫৯) সম্মানে বিজিত অঞ্চলের নামকরণ করেন খলিফাতাবাদ। তিনিই সম্ভবত ষাটগম্বজ মসজিদের নির্মাতা। ১৪৫৯ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত খান জাহান হাভেলি-খলিফাতাবাদ থেকে উক্ত অঞ্চল শাসন করেন। তাঁর শাসনকৃত অঞ্চলটিকে বর্তমান বাগেরহাটের সাথে অভিন্ন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে এরূপ অসাধারণ একটি ভবন ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার এর সংস্কার ও মেরামতের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং পরবর্তীসময়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ধারাবাহিকভাবে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। বিশ শতকের আশির দশকের শুরুতে ইউনেসকো-র (UNESCO) উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটির রক্ষণাবেক্ষণে এক কার্যকরী ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং তা বর্তমানে শেষের পর্যায়ে।

ভূমি নকশা ও বর্ণনা প্রাচীর বেষ্টিত মসজিদটি বর্তমান বাগেরহাট শহর থেকে তিন মাইল পশ্চিমে ঘোড়াদিঘির পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। প্রাচীরবেষ্টিত মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য আদিতে দুটি প্রবেশপথ ছিল- একটি পূর্বদিকে এবং অন্যটি উত্তর দিকে। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি বর্তমানে পুনঃনির্মাণ করা হলেও উত্তর দিকেরটি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি, যা নিজেই একটি স্বতন্ত্র ভবনের দাবিদার, মসজিদের কেন্দ্রীয় খিলানপথ বরাবর স্থাপিত। খিলান সম্বলিত প্রবেশপথটি ৭.৯২ মিটার দীর্ঘ ও ২.৪৪ মিটার চওড়া। এটি ২.৪৪ মিটার পুরু এবং এর উপরিভাগ সুদৃশ্যভাবে বাঁকানো।

বিশাল আয়তাকার মসজিদ ভবনটি মূলত ইট নির্মিত। বাইরের দিক থেকে এর পরিমাপ চার কোণে অবস্থিত দ্বিতল টাওয়ারসহ উত্তর-দক্ষিণে ৪৮.৭৭ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৩২.৯২ মিটার। মসজিদ অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য রয়েছে খিলানপথ। পূর্ব প্রাচীরে এগারোটি, উত্তর এবং দক্ষিণ প্রাচীরে সাতটি করে। পশ্চিম প্রাচীরে একটি খিলানপথ রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেভ-এর ঠিক উত্তর পার্শ্বস্থ ‘বে’ বরাবর পশ্চিম প্রাচীরের খিলানপথটি অবস্থিত। মসজিদ অভ্যন্তরের পরিমাপ ৪৩.৮৯ মিটার × ২৬.৮২ মিটার। মসজিদ অভ্যন্তর ছয় সারি স্তম্ভ সহকারে উত্তর-দক্ষিণে সাতটি আইল এবং পূর্ব-পশ্চিমে এগারোটি ‘বে’তে বিভক্ত।

কেন্দ্রীয় বে-এর ঠিক উত্তর পাশেরটি ব্যতীত সব কয়টি ‘বে’ কিবলা প্রাচীরে অর্ধ গোলাকার মিহরাব কুলুঙ্গিতে শেষ হয়েছে। ফলে মসজিদটিতে রয়েছে মোট দশটি মিহরাব। কেন্দ্রীয় নেভ (nsve) বরাবর অবস্থিত কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পার্শ্ববর্তী মিহরাবগুলি অপেক্ষা বড় এবং ছাদ পর্যন্ত উঁচু একটি অভিক্ষিপ্ত আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে ন্যস্ত।

মসজিদের প্রবেশপথের খিলানগুলি দ্বিকেন্দ্রিক ধরনের এবং প্রাচীরের মাঝামাঝি থেকে উত্থিত। পূর্ব ফাসাদের সব কয়টি খিলানপথ এবং উত্তর ও দক্ষিণের কেন্দ্রীয় এবং পশ্চিমের একমাত্র খিলানপথ সামান্য কুলুঙ্গিত আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে ন্যস্ত। বাকি খিলানপথগুলি পরপর দুটি খিলান সমন্বয়ে তৈরি, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ খিলানটি বাইরেরটির তুলনায় সামান্য বড়। পূর্ব দিকের দেয়াল ব্যতীত সমগ্র ভবনের বহিস্থ দেয়াল জুড়ে অনুভূমিক অভিক্ষেপ ও দ্বৈত কুলুঙ্গি নকশার অলঙ্করণ রয়েছে। ভবনের সরছিদ্র (battlements) ও কার্নিস বাঁকানো। তবে স্বাভাবিক বক্ররেখা দ্বারা বেষ্টিত না হয়ে পূর্ব ফাসাদের কেন্দ্রীয় খিলানপথের উপরের কার্নিসে একটি বিচিত্র ত্রিভুজাকার পেডিমেন্ট স্থাপিত। এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় কিশোরগঞ্জের এগারোসিন্ধুর-এর সাদী মসজিদ-এ (১৬৫২)।
মসজিদের চার বহিঃস্থ কোণে স্থাপিত গোলাকার টাওয়ার বিশালাকৃতির এবং উপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে। প্রত্যেকটি টাওয়ারই ছাদ ছাড়িয়ে উপরে উঠে গেছে। এগুলি খোলা খিলান চেম্বার বিশিষ্ট ও ছোট গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। সম্মুখ ভাগের টাওয়ার দুটির উপরের চেম্বার চার দিকে স্থাপিত চারটি খিলান জানালা বিশিষ্ট। আর পেছনের টাওয়ার দুটিতে রয়েছে একজোড়া খিলান জানালা, একটি উত্তর দিকে অন্যটি দক্ষিণ দিকে। পিছনের দিকের টাওয়ার দুটির জানালাগুলি ঠিক একই অক্ষরেখায় অবস্থিত নয়। সম্মুখ ভাগের টাওয়ার দুটিতে ভেতরের দিক দিয়ে ২৬ ধাপের প্যাঁচানো সিড়ি রয়েছে। এই সিড়ির মাধ্যমে উপরের চেম্বারে উঠা যায়। সিড়ির প্রবেশপথ রয়েছে মসজিদের ভেতরের দিকে। সম্প্রতি এই প্রবেশপথগুলি ইটের প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পেছনের টাওয়ার দুটি সামনের টাওয়ার দুটির মতো নয়। পেছনের টাওয়ার দুটি নিচ্ছিদ্র এবং এগুলির চেম্বারে শুধু উপরের ছাদ দিয়েই প্রবেশ করা যায়।

পূর্ব থেকে পশ্চিম দৈর্ঘ্য বরাবর প্রসারিত বিশাল কেন্দ্রীয় নেভ মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। ৪.৮৮ মিটার × ৩.৯৬ মিটার আয়তাকার স্বতন্ত্র সাতটি ‘বে’ সম্বলিত এই নেভ মসজিদ অভ্যন্তরকে সমান দুটি অংশে বিভক্ত করেছে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকের খিলানপথ দিয়ে এই অংশগুলিতে প্রবেশ করা যায়। এই অংশ দুটি আবার সর্বমোট সত্তরটি বর্গাকার ‘বে’ দ্বারা বিভক্ত। এই বর্গাকার ‘বে’গুলি ৩.৯৬ মিটার বাহু বিশিষ্ট এবং উপরে পেয়ালাকৃতির গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেভের আয়তাকার ‘বে’গুলি চৌচালা ভল্ট দ্বারা আচ্ছাদিত। এই ভল্ট ও পেয়ালাকৃতির গম্বুজসমূহ পরষ্পর ছেদী খিলানের উপর স্থাপিত। খিলানগুলি মসজিদ অভ্যন্তরের স্তম্ভ থেকে উত্থিত। আর খিলানের কোণগুলি ভরাট করা হয়েছে বাংলা পেন্ডেন্টিভ দ্বারা। ফলে মসজিদটি সর্বমোট একাশিটি গম্বুজ সমৃদ্ধ- চারটি কর্ণার টাওয়ারের উপর, সত্তরটি পাশের দুই অংশের উপর এবং সাতটি চৌচালা ভল্ট কেন্দ্রীয় নেভের উপর।

অসংখ্য গম্বুজ সমৃদ্ধ মসজিদের বিশাল ছাদটির ভারবহন করছে মসজিদ অভ্যন্তরীস্থ স্তম্ভসারি। মসজিদে উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত ছয়টি স্তম্ভসারি বিদ্যমান। প্রতিটি সারিতে রয়েছে দশটি করে স্তম্ভ। সুতরাং মসজিদটিতে সর্বমোট ষাটটি স্তম্ভ রয়েছে যার বেশিরভাগই সরু প্রস্তর।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত,(১৮২৪-১৮৭৩) মহাকবি, নাট্যকার, বাংলাভাষার সনেট প্রবর্তক, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে, এক জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল। মা জাহ্নবী দেবীর তত্ত্বাবধানে মধুসূদনের শিক্ষারম্ভ হয়। প্রথমে তিনি সাগরদাঁড়ির পাঠশালায় পড়াশোনা করেন। পরে সাত বছর বয়সে তিনি কলকাতা যান এবং খিদিরপুর স্কুলে দুবছর পড়ার পর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন।

হিন্দু কলেজে অধ্যয়নকালেই মধুসূদনের প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৮৩৪ সালে তিনি কলেজের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ইংরেজি ‘নাট্য-বিষয়ক প্রস্তাব’ আবৃত্তি করে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ, যাঁরা পরবর্তী জীবনে স্বস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মধুসূদন উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কলেজের পরীক্ষায় তিনি বরাবর বৃত্তি পেতেন। এ সময় নারীশিক্ষা বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন।

হিন্দু কলেজে অধ্যয়নের সময়েই মধুসূদন কাব্যচর্চা শুরু করেন। তখন তাঁর কবিতা জ্ঞানান্বেষণ, Bengal Spectator, Literary Gleamer, Calcutta Library Gazette, Literary Blossom, Comet প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হতো।

এ সময় থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিলেত যাওয়ার। তাঁর ধারণা ছিল বিলেতে যেতে পারলেই বড় কবি হওয়া যাবে। তাই পিতা তাঁর বিবাহ ঠিক করলে তিনি ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি গ্রহণ করেন এবং তখন থেকে তাঁর নামের পূর্বে ‘মাইকেল’ শব্দটি যুক্ত হয়। কিন্তু হিন্দু কলেজে খ্রিস্টানদের অধ্যয়ন নিষিদ্ধ থাকায় মধুসূদনকে কলেজ ত্যাগ করতে হয়। তাই ১৮৪৪ সালে তিনি বিশপ্স কলেজে ভর্তি হন এবং ১৮৪৭ পর্যন্ত এখানে অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি ইংরেজি ছাড়াও গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শেখার সুযোগ পান।

এ সময় ধর্মান্তরের কারণে মধুসূদন তাঁর আত্মীয়স্বজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর পিতাও এক সময় অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দেন। অগত্যা মধুসূদন ভাগ্যান্বেষণে ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজ গমন করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। প্রথমে মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান অ্যাসাইলাম স্কুলে (১৮৪৮-১৮৫২) এবং পরে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা (১৮৫২-১৮৫৬) করেন।

মাদ্রাজের সঙ্গে মধুসূদনের জীবনের অনেক ঘটনা জড়িত। এখানেই তিনি সাংবাদিক ও কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি Eurasion (পরে Eastern Guardian), Madras Circulator and General Chronicle ও Hindu Chronicle পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং Madras Spectator-এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন (১৮৪৮-১৮৫৬)। মাদ্রাজে অবস্থানকালেই Timothy Penpoem ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ The Captive Ladie (১৮৪৮) এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ Visions of the Past প্রকাশিত হয়। রেবেকা ও হেনরিয়েটার সঙ্গে তাঁর যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ এখানেই সংঘটিত হয়। মাদ্রাজে বসেই তিনি হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষা করেন।

এরমধ্যে মধুসূদনের পিতামাতা উভয়ের মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী হেনরিয়েটাকে নিয়ে ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা আসেন। সেখানে তিনি প্রথমে পুলিশ কোর্টের কেরানি এবং পরে দোভাষীর কাজ করেন। এ সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেও তিনি প্রচুর অর্থোপার্জন করেন। তাঁর বন্ধুবান্ধবরা এ সময় তাঁকে বাংলায় সাহিত্যচর্চা করতে অনুরোধ জানান এবং তিনি নিজেও ভেতর থেকে এরূপ একটি তাগিদ অনুভব করেন। রামনারায়ণ তর্করত্নের রত্নাবলী (১৮৫৮) নাটক ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব অনুভব করেন এবং তাঁর মধ্যে তখন বাংলায় নাটক রচনার সংকল্প জাগে। এই সূত্রে তিনি কলকাতার পাইকপাড়ার রাজাদের বেলগাছিয়া থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। এমন একটি পরিস্থিতিতে নাট্যকার হিসেবেই মধুসূদনের বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে পদার্পণ ঘটে। তিনি মহাভারতের দেবযানী-যযাতি কাহিনী অবলম্বনে ১৮৫৮ সালে পাশ্চাত্য রীতিতে রচনা করেন শর্মিষ্ঠা নাটক। এটিই প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক এবং একই অর্থে মধুসূদনও বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাট্যকার।

পরের বছর মধুসূদন রচনা করেন দুটি প্রহসন: একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ। প্রথমটিতে তিনি ইংরেজি শিক্ষিত ইয়ং বেঙ্গলদের মাদকাসক্তি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচারকে কটাক্ষ করেন এবং দ্বিতীয়টিতে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের আচারসর্বস্ব ও নীতিভ্রষ্ট সমাজপতিদের গোপন লাম্পট্য তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রেও মধুসূদন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রহসন দুটি কাহিনী, সংলাপ ও চরিত্রসৃষ্টির দিক থেকে আজও অতুলনীয়।

মধুসূদনের কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি যাকিছু রচনা করেছেন তাতেই নতুনত্ব এনেছেন। তিনিই প্রথম পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ বাংলা সাহিত্যে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেন। তখনকার বাংলা সাহিত্যে রচনার শৈলীগত এবং বিষয়ভাবনাগত যে আড়ষ্টতা ছিল, মধুসূদন তা অসাধারণ প্রতিভা ও দক্ষতাগুণে দূরীভূত করেন। ১৮৬০ সালে তিনি গ্রিক পুরাণ থেকে কাহিনী নিয়ে রচনা করেন পদ্মাবতী নাটক। এ নাটকেই তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ইংরেজি কাব্যের অনুকরণে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার বরেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার এটাই প্রথম এবং এর ফলে তিনি বাংলা কাব্যকে ছন্দের বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহারে এই সফলতা তাঁকে ভীষণভাবে উৎসাহিত করে এবং এই ছন্দে একই বছর তিনি রচনা করেন তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য। পরের বছর ১৮৬১ সালে রামায়ণের কাহিনী নিয়ে একই ছন্দে তিনি রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। এটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক মহাকাব্য। আর কোন রচনা না থাকলেও মধুসূদন এই একটি কাব্য লিখেই অমর হয়ে থাকতে পারতেন। এই কাব্যের মাধ্যমেই তিনি মহাকবির মর্যাদা লাভ করেন।

জীবনানন্দ দাশ, (১৮৯৯-১৯৫৪) কবি,শিক্ষাবিদ। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বিক্রমপুরের গাওপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন স্কুলশিক্ষক ও সমাজসেবক। তিনি ব্রহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন একজন কবি।

জীবনানন্দ বরিশাল ব্রজমোহন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯১৫), বি এম কলেজ থেকে আই.এ (১৯১৭) এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ (১৯১৯) ও ইংরেজিতে এম.এ (১৯২১) পাস করেন। আইন কলেজে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি পরীক্ষা দেননি।
জীবনানন্দ কলকাতা সিটি কলেজে ১৯২২ সালে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯২৯ সালে তিনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র কলেজে যোগ দেন, কিন্তু কিছুদিন পর চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। ওই বছরই (১৯২৯) তিনি দিল্লির রামযশ কলেজে যোগ দেন এবং ১৯৩০-এ আবার দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। পরে কিছুকাল বেকার থেকে জীবনানন্দ ১৯৩৫ সালে বরিশালের বিএম কলেজে যোগদান করেন। এভাবে তাঁর কর্মজীবন বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনায় এবং মাঝে মাঝে অন্য পেশায় অতিবাহিত হয়। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের কিছু আগে তিনি সপরিবারে কলকাতা চলে যান।

জীবনানন্দ ছিলেন বাংলা কাব্যান্দোলনে রবীন্দ্রবিরোধী তিরিশের কবিতা নামে খ্যাত কাব্যধারার অন্যতম কবি। পাশ্চাত্যের মডার্নিজম ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বঙ্গীয় সমাজের বিদগ্ধ মধ্যবিত্তের মনন ও চৈতন্যের সমন্বয় ঘটে ওই কাব্যান্দোলনে।

জীবনানন্দের কাব্যচর্চার শুরু অল্পবয়স থেকেই। স্কুলে ছাত্রাবস্থায় তাঁর প্রথম কবিতা ‘বর্ষ-আবাহন’ ব্রহ্মবাদী পত্রিকায় (বৈশাখ ১৩২৬/এপ্রিল ১৯১৯) প্রকাশিত হয়। মূলত কবি হলেও তিনি অসংখ্য ছোটগল্প, কয়েকটি উপন্যাস ও প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালক প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলি হচ্ছে ধূসর পান্ডুলিপি (১৯৩৬), বনলতা সেন (১৯৪২), মহাপৃথিবী (১৯৪৪), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮), রূপসী বাংলা (রচনাকাল ১৯৩৪, প্রকাশকাল ১৯৫৭), বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১)। এছাড়াও বহু অগ্রন্থিত কবিতা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

ঔপন্যাসিক ও গল্পকার হিসেবে জীবনানন্দের স্বতন্ত্র প্রতিভা ও নিভৃত সাধনার উন্মোচন ঘটে মৃত্যুর পরে প্রাপ্ত অসংখ্য পান্ডুলিপিতে। ল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে মাল্যবান, সুতীর্থ, জলপাইহাটি, জীবনপ্রণালী, বাসমতীর উপাখ্যান ইত্যাদি। তাঁর রচিত গল্পের সংখ্যা প্রায় দুশতাধিক। কবিতার কথা (১৯৫৫) নামে তাঁর একটি মননশীল ও নন্দনভাবনামূলক প্রবন্ধগ্রন্থ আছে। সম্প্রতি

কলকাতা থেকে তাঁর গদ্যরচনা ও অপ্রকাশিত কবিতার সংকলনরূপে জীবনানন্দ সমগ্র (১৯৮৫-৯৬) নামে বারো খন্ড রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে।

জীবনানন্দের প্রথম কাব্যে নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথ ও মোহিতলালের কাব্যধারার প্রভাব থাকলেও দ্বিতীয় কাব্য থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন মৌলিক ও ভিন্ন পথের অনুসন্ধানী। রবীন্দ্রনাথের নিবিড় প্রকৃতিচেতনা তাঁর কবিতায় গভীর দ্যোতনা লাভ করেছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ ও রূপকথা-পুরাণের জগৎ তাঁর কাব্যে হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়। বিশেষত, রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থে যেভাবে আবহমান বাংলার চিত্ররূপ ও অনুসূক্ষ্ম সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ হিসেবে খ্যাত হয়েছেন। তবে প্রকৃতির পাশাপাশি জীবনানন্দের শিল্পজগতে মূর্ত হয়েছে বিপন্ন মানবতার ছবি এবং আধুনিক নগরজীবনের অবক্ষয়, হতাশা, নিঃসঙ্গতা ও সংশয়বোধ।

জীবনানন্দ ছিলেন একজন কালসচেতন ও ইতিহাসচেতন কবি। তিনি ইতিহাসচেতনা দিয়ে অতীত ও বর্তমানকে অচেচ্ছদ্য সম্পর্কসূত্রে বেঁধেছেন। তাঁর কবিস্বভাব ছিল অন্তর্মুখী, দৃষ্টিতে ছিল চেতনা থেকে নিশ্চেতনা ও পরাচেতনার শব্দরূপ আবিষ্কারের লক্ষ্য। এ সূত্রে তিনি ব্যবহার করেছেন ইম্প্রেশনিস্টিক রীতি, পরাবাস্তবতা, ইন্দ্রিয়বিপর্যাস (synaesthesia) ও রঙের অত্যাশ্চর্য টেকনিক। আধুনিক কাব্যকলার বিচিত্র ইজম প্রয়োগ ও শব্দনিরীক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর অনন্যতা বিস্ময়কর। বিশেষত, কবিতায় উপমা প্রয়োগে জীবনানন্দের নৈপুণ্য তুলনাহীন। কবিতাকে তিনি মুক্ত আঙ্গিকে উত্তীর্ণ করে গদ্যের স্পন্দনযু্ক্ত করেন, যা পরবর্তী কবিদের প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে।

জীবনানন্দের গল্প-উপন্যাসে অভিব্যক্ত হয়েছে দাম্পত্যজীবনের সঙ্কট, নরনারীর মনস্তত্ত্ব ও যৌনসম্পর্কের জটিলতা এবং সমকালের আর্থসামাজিক কাঠামোর বিপর্যয়। তাঁর প্রায় গল্প-উপন্যাস আত্মজৈবনিকতার প্রকাশ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে জীবনানন্দের কবিতার ভূমিকা ঐতিহাসিক। ষাটের দশকে বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে সংগ্রামী বাঙালি জনতাকে তাঁর রূপসী বাংলা তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত করে।

জীবনানন্দের বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থ নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলনে পুরস্কৃত (১৯৫৩) হয়। এছাড়া জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থটিও ভারত সরকারের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৫৪) লাভ করে। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

জাতীয় দিবসঃ- বাংলাদেশে জাতীয় দিবস হিসেবে শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ ও বিজয় দিবস সর্বজনীনভাবে উদ্যাপিত হয়ে থাকে।

শহীদ দিবস বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ শহীদ দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের এ দিনে যুবসম্প্রদায়, বিশেষত ছাত্ররা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বাঙালি জনগণ এ সিদ্ধান্তকে তাদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে এ দিনে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালায়। এতে কয়েকজন ছাত্র ও সাধারণ লোক নিহত হয়। আবুল বরকত, আবদুস সালাম, আবদুল জববার, রফিক উদ্দিন আহমদ এবং আরও অনেক নাম-না-জানা লোক শহীদ হন। পরবর্তী সময়ে গণঅভ্যুত্থান এমন ব্যাপক রূপ পরিগ্রহ করে যে, সরকার নতি স্বীকার করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতি দানে বাধ্য হয়। পাকিস্তানি শাসকচক্র কর্তৃক সাংস্কৃতিক অন্তর্ঘাতের বিরুদ্ধে এটি ছিল বাঙালিদের প্রথম উল্লেখযোগ্য বিজয়। এরপর থেকেই এ ঘটনাটি স্বায়ত্তশাসনের দাবির আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালিদের অনুপ্রাণিত করেছে। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে এ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০০ সাল থেকে দিবসটি সমগ্র বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে শহীদ দিবস উদযাপিত হয়। মধ্যরাত থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে (সারা দেশে এর প্রতিরূপ কাঠামো রয়েছে) পুষ্পস্তবক অর্পণের জন্য মানুষের ঢল নামে। লোকজন মৌনভাবে অথবা অমর একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গাইতে গাইতে শহীদ মিনারের দিকে এগোতে থাকে। মানুষ নগ্নপদে আজিমপুর গোরস্তানেও যায় যেখানে শহীদরা চিরনিদ্রায় শায়িত। মধ্য-সকাল নাগাদ গোটা শহীদ মিনার বেদী ফুলে ঢাকা পড়ে যায়। শহীদ মিনারের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের দেয়ালগুলি বাংলা সাহিত্য থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে সাজানো হয় এবং কবিদের সড়কদ্বীপে কবিতা আবৃত্তি করতে দেখা যায়। এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।

স্বাধীনতা দিবস ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্বিচার গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। তখন থেকেই এ দিনটি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু ১৯৮০ সালের ৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবেও উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এ দিবসে সকল সরকারি ভবন শীর্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পথঘাট ও ঘরবাড়ি রঙবেরঙের ব্যানার ও ফেস্টুনে সজ্জিত করা হয়। সকালে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা কুচকাওয়াজ ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে, সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় এবং রাজপথ আলোকমালায় সজ্জিত হয়। হাসপাতাল, এতিমখানা ও জেলখানায় উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয়।

পহেলা বৈশাখ স্মরণাতীত কাল থেকে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ দেশের লোকজ ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়ে আছে। বৈশাখী মেলা বা উৎসব এদেশে বছরের সর্ববৃহৎ ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব এবং বাঙালি সংস্কৃতির একান্ত নিজস্ব ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা বর্ষপঞ্জি, দেশের উৎপাদনশীলতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। বর্ষপঞ্জিটি কৃষিচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এ সংযোগ এতই অবিচ্ছেদ্য যে, বাঙলা নববর্ষ ‘ফসলি বর্ষ’ বা ‘ফসল বর্ষ’ নামেও পরিচিত ছিল। এ উৎসবে কোনো ধর্মীয় প্রভাব নেই এবং এটা অবাধে সংস্কৃত ও ফার্সি-আরবি ঐতিহ্য থেকে গৃহীত।

বিজয় দিবস ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পালিত হয়। ঐদিন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর নববই হাজার সদস্য বাংলাদেশ ও ভারতের সম্মিলিত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। দিনটি যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য ও জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনাসহ উদযাপিত হয়ে থাকে। ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে প্রত্যুষে দিবসটির সূচনা ঘোষণা করা হয়। এদিন রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত সামরিক কুচকাওয়াজে সব ধরনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা যোগ দেয়। এ কুচকাওয়াজ দেখার জন্য শতসহস্র লোক জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে সমবেত হয়ে থাকে। স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ঢাকার অদূরে সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
[হেলাল উদ্দিন আহমেদ]

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর(১৮২০-১৮৯১) সংস্কৃত পন্ডিত, লেখক, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, জনহিতৈষী। তিনি ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের পাঠশালায় পাঠানো হয়। ১৮২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে কলকাতার একটি পাঠশালায় এবং ১৮২৯ সালের জুন মাসে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করানো হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ছাত্র এবং ১৮৩৯ সালের মধ্যেই বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। পরে তিনি দু-বছর ওই কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, ন্যায়, তর্ক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিন্দু আইন এবং ইংরেজি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। তাছাড়া প্রতি বছরই তিনি বৃত্তি এবং গ্রন্থ ও আর্থিক পুরস্কার পান।

১৮৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে সংস্কৃত কলেজ ত্যাগ করার অল্প পরেই তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের বাংলা ভাষার প্রধান পন্ডিতের পদ লাভ করেন। ১৮৪৬ সালের এপ্রিল মাসে সংস্কৃত কলেজে সহকারী সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত কলেজের শিক্ষকগণের রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে ১৮৪৭ সালের জুলাই মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজের কাজে ইস্তফা দেন এবং ১৮৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের হেড রাইটার ও কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৮৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক পদ লাভ করেন এবং পরের মাসে ওই কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।
অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি কলেজের অনেক সংস্কার করেন। এর আগে এ কলেজে পড়ার অধিকার ছিল কেবল ব্রাহ্মণ এবং বৈদ্য ছাত্রদের, কিন্তু তিনি সব শ্রেণির হিন্দুদের জন্যে কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করেন। তিনি কলেজে পড়ার জন্যে নামেমাত্র বেতন চালু করেন এবং প্রতিপদ ও অষ্টমীর বদলে রবিবার সপ্তাহিক ছুটি চালু করেন। কলেজের ডিগ্রি নিয়ে যাতে ছাত্ররা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ লাভ করতে পারে, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি সে প্রতিশ্রুতিও আদায় করেন। কিন্তু তিনি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনেন কলেজের পাঠ্যক্রমে। পূর্বে ব্যাকরণ এবং বীজগণিত ও গণিত শেখানো হতো সংস্কৃতে, কিন্তু তিনি সংস্কৃতের বদলে ব্যাকরণ বাংলার মাধ্যমে এবং গণিত ইংরেজির মাধ্যমে পড়ানোর নিয়ম চালু করেন। ইংরেজি ভাষা শেখাকে তিনি বাধ্যতামূলক করেন এবং ইংরেজি বিভাগকে উন্নত করেন। বাংলা শিক্ষার ওপরও তিনি জোর দেন। তবে তারচেয়ে ব্যাপক পরিবর্তন করেন দর্শন পাঠ্যক্রমে। তিনি সাংখ্য এবং বেদান্ত দর্শনকে ভ্রান্ত এবং প্রাচীনপন্থী বলে বিবেচনা করতেন। সে জন্যে, তিনি বার্কলের দর্শন এবং অনুরূপ পাশ্চাত্য দর্শন শিক্ষাদানের বিরোধিতা করেন এবং তার পরিবর্তে বেকনের দর্শন এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের তর্কশাস্ত্র পড়ানোর সুপারিশ করেন। অনেকে তাঁর সমালোচনা করলেও, তাঁর এ সংস্কার ছিল সুদূরপ্রসারী এবং শিক্ষা পরিষদ তাঁর এ সংস্কারের প্রশংসা করে এবং পুরস্কারস্বরূপ ১৮৫৪ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর বেতন বৃদ্ধি করে।

১৮৫৪ সালে চার্লস উডের শিক্ষা সনদ গৃহীত হওয়ার পর সরকার গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশে ১৮৫৫ সালের মে মাসে বিদ্যাসাগরকে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদের অতিরিক্ত সহকারী স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি এবং মেদিনীপুর জেলায় স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। দুবছরের মধ্যে তিনি এ রকমের বিশটি স্কুল স্থাপন করেন। এছাড়া তিনি এসব স্কুলে পড়ানোর জন্যে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি নর্মাল স্কুল স্থাপন করেন। তিনি নিজ গ্রামে নিজ খরচে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

এসব বাংলা মডেল স্কুল ছাড়া, সরকার বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন রক্ষণশীল সমাজ মনে করতো যে, স্ত্রীশিক্ষা দেওয়া নিষিদ্ধ। সমাজের তীব্র বিরোধিতার মুখে এ ধরনের স্কুল প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে কিনা—সরকার সে সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল না। অন্যদিকে, বিদ্যাসাগর ছিলেন স্ত্রীশিক্ষার বিশেষ সমর্থক। সরকার সেজন্যে এ কাজের দায়িত্ব দেয় তাঁর ওপর। তিনি বালিকা বিদ্যালয় খোলার বিষয়ে স্থানীয় লোকদের সমর্থনে বর্ধমানে একটি স্কুল স্থাপন করেন। পরে ১৮৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে আরও পঁয়ত্রিশটি স্কুল স্থাপন করতে সমর্থ হন।

কিন্তু শিক্ষা কর্তৃপক্ষের পরিচালকের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কারণে তিনি এ কাজ বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেননি। তাই তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদ এবং স্কুল পরিদর্শকের পদ-উভয় ত্যাগ করেন। এ রকমের উচ্চপদে বাঙালিদের মধ্যে সম্ভবত তিনিই অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরে শিক্ষা সম্প্রসারণের কাজে, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার কাজ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। এ সময়ে তিনি বেথুন সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হন। এই সোসাইটির কাজ ছিল স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার এবং পরিবার ও সমাজে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধির। তিনি স্কুল স্থাপনের জন্যে ধনী জমিদারদেরও উৎসাহ প্রদান করেন।

ধনী পরিবারের ছেলেদের ইংরেজি শেখানোর উদ্দেশে ১৮৫৯ সালে কলকাতা মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন স্থাপিত হয়। কিন্তু দুবছরের মধ্যে এ স্কুল বন্ধের উপক্রম হলে বিদ্যাসাগর এ স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৮৬৪ সালে তিনি এর নাম রাখেন হিন্দু মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউট। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নিয়ে তিনি এ স্কুলে এন্ট্রেন্স পরীক্ষার জন্য ছাত্রদের শিক্ষা দিতে থাকেন এবং ক্রমান্বয়ে সাফল্য লাভ করেন। ১৮৭২ সালের গোড়ার দিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এ বিদ্যালয়কে কলেজ এবং ১৮৭৯ সালে ডিগ্রি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

সংস্কৃত কলেজের সংস্কার ও আধুনিকীকরণ এবং বাংলা ও বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন ছাড়া, শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো পাঠ্যপুস্তক রচনা ও প্রকাশ করা। বর্ণপরিচয় (১৮৫১) প্রকাশের আগ পর্যন্ত প্রথম শিক্ষার্থীদের জন্যে এ রকমের কোনো আদর্শ পাঠ্যপুস্তক ছিল না। তাঁর বর্ণপরিচয়ের মান এতো উন্নত ছিল যে, প্রকাশের পর থেকে অর্ধশতাব্দী পর্যন্ত এই গ্রন্থ বঙ্গদেশের সবার জন্যে পাঠ্য ছিলো। দেড়শো বছর পরেও এখনও এ গ্রন্থ মুদ্রিত হয়। বর্ণপরিচয়ের মতো সমান সাফল্য লাভ করেন তিনি।

আলাওল(আনু. ১৬০৭-১৬৮০) মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। আনুমানিক ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলার ফতেয়াবাদ পরগনার জালালপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ফতেয়াবাদের অধিপতি মজলিস কুতুবের একজন অমাত্য। অভিজাত পরিবারের সন্তান হিসেবে আলাওল বাল্যকালে বাংলা, সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষা শেখেন। যুদ্ধবিদ্যা ও সঙ্গীত বিষয়েও তাঁর জ্ঞান ছিল।

একবার পিতার সঙ্গে নৌকাযোগে চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের দ্বারা তাঁরা আক্রান্ত হন। এতে তাঁর পিতা নিহত হন এবং আলাওল আহত ও বন্দি অবস্থায় আরাকানে (বার্মা) নীত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল কম। আরাকানে তিনি একজন দেহরক্ষী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরে মহন্তের গৃহে নাটগীত ও সঙ্গীত শিক্ষকের কাজ করেন।

এ সময় তাঁর কবিপ্রতিভার স্ফুরণ ঘটলে প্রধান অমাত্য কোরেশী মাগন ঠাকুরের (১৬৪৫-৫৮) আনুকূল্যে তিনি আরাকানের অমাত্যসভায় স্থান পান। পরে একে একে সৈয়দ মুসা (রাজ-অমাত্য), সুলায়মান (প্রধান অমাত্য), মুহাম্মদ খান (সৈন্যমন্ত্রী) ও মজলিস নবরাজ (রাজস্বমন্ত্রী) কবিকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। তিনি তাঁদের নিকট থেকে বিভিন্ন পুস্তক রচনার প্রেরণা পান। ১৬৫৯-৬০ সালে শাহ সুজা রোসাঙ্গে (আরাকান) আশ্রয়প্রার্থী হন এবং বিদ্রোহ করে সপরিবারে নিহত হন। এ বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আলাওল পঞ্চাশ দিন কারাভোগ করেন এবং আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা স্ত্রীপুত্রসহ প্রায় দশ বছর অতিবাহিত করেন। শেষ বয়সে আধ্যাত্মিক গুরু মসউদ শাহ্ তাঁকে ‘কাদেরী খিলাফত’ প্রদান করেন।

আলাওল মধ্যযুগের সর্বাধিক গ্রন্থপ্রণেতা। তাঁর মোট কাব্যসংখ্যা সাত। সেগুলির মধ্যে আখ্যানকাব্য হচ্ছে পদ্মাবতী (১৬৪৮), সতীময়না-লোর-চন্দ্রানী (১৬৫৯), সপ্তপয়কর (১৬৬৫), সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল (১৬৬৯) ও সিকান্দরনামা (১৬৭৩); নীতিকাব্য তোহফা (১৬৬৪) এবং সঙ্গীতবিষয়ক কাব্য রাগতালনামা। এ ছাড়াও বৈষ্ণবপদের অনুরূপ তাঁর কিছু গীতিকবিতা আছে। রাগতালনামা ও গীতিকবিতাগুলি তাঁর মৌলিক রচনা, অন্যগুলি অনুবাদমূলক। পদ্মাবতী মালিক মুহম্মদ জায়সীকৃত হিন্দি পদুমাবত, সতীময়না-লোর-চন্দ্রানী সাধনকৃত মৈনাসত, সপ্তপয়কর নিজামী গঞ্জভীকৃত ফারসি হফত্ পয়কর, তোহফা ইউসুফ গদাকৃত ফারসি তুহুফ-ই-নসাঈহ, সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল গাওয়াসীকৃত ফারসি সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল এবং সিকান্দরনামা নিজামী গঞ্জভীকৃত ফারসি সিকান্দরনামা অনুসরণে রচিত।

রাগতালনামা ও গীতিপদসমূহ তাঁর প্রথম দিকের রচনা। কাব্যগুলির মধ্যে পদ্মাবতী তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা। নাগরিক শিক্ষা, বৈদগ্ধ্য ও অভিপ্রায় তাঁর কাব্যের ভাব-ভাষা-রুচিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। দরবার-সংস্কৃতির সব লক্ষণই তাঁর রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। কাব্যিক আবেগের সঙ্গে বৌদ্ধিক চেতনার মিশ্রণ থাকায় আলাওলকে ‘পন্ডিতকবি’ বলা হয়।
[ওয়াকিল আহমদ]

আকবর(১৫৫৬-১৬০৫) পিতা হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুর পর মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে মুগল সিংহাসনে আরোহণ করেন। একজন বিজয়ী বীর, প্রশাসক ও শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য মহামতি আকবর তাঁর সমসাময়িক বিখ্যাত শাসকদের মধ্যে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন।

আকবরের সিংহাসন আরোহণের পরপরই আগ্রা ও দিল্লি আদিল শাহ শূরের সেনাপতি হিমুর অধিকারে চলে যায়। রাজা বিক্রমজিৎ উপাধি গ্রহণ করার পর হিমু আকবর এবং বৈরাম খানের মোকাবেলা করতে অগ্রসর হন। নিষ্পত্তিমূলক পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে হিমু আহত ও বন্দি হন এবং পরবর্তীকালে নিহত হন। আগ্রা ও দিল্লি দখলের মাধ্যমে মুগল শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠিতা ঘটে।

আকবর সিংহাসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সাম্রাজ্য বিস্তারে প্রবৃত্ত হন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি কোনো নির্দিষ্ট ভূখন্ডের অধিপতি ছিলেন বলে মনে হয় না। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর সময় আকবরের বিশাল সাম্রাজ্য কাবুল থেকে বাংলা এবং হিমালয় থেকে আহমেদনগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব, উত্তর-পশ্চিম এবং দাক্ষিণাত্যে তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটে।

আকবরের রাজত্বকালে বাংলায় মুগল রাজত্বের প্রসার ঘটে। বাংলার সুলতান দাউদ কররানীর বিরুদ্ধে আকবর মুনিম খানকে বাংলা অভিযানে প্রেরণ করেন। দাউদ পালিয়ে যান এবং মুগলদের হাতে পাটনার পতন ঘটে। পরবর্তীকালে মুনিম খান দাউদের রাজধানী তান্ডা অধিকার করেন। এতদসত্ত্বেও উড়িষ্যায় দাউদ মুগল-বিরোধী তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। আফগানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য টোডরমল এসে মুনিম খানের সঙ্গে যোগ দেন। ১৫৭৫ সালে তুকারয়-এর যুদ্ধে দাউদ পুনরায় পরাজিত হন। ইতোমধ্যে মুনিম খানের মৃত্যু হয় এবং খান জাহান হুসেন কুলী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে রাজমহলের যুদ্ধে হুসেন কুলী কর্তৃক দাউদ চূড়ান্তভাবে পরাজিত ও নিহত হন। দৃশ্যত বাংলা মুগলদের অধিকারে আসে।

ঈসা খানের নেতৃত্বে বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত বাংলার শক্তিশালী জমিদারগণ মুগল কর্তৃত্ব অস্বীকার করে বাংলায় তাঁদের স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এঁদের আনুগত্য লাভের উদ্দেশ্যে আকবর তাঁর বেশকিছু সময় বারো ভুঁইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। তিনি খান জাহান হুসেন কুলী (১৫৭৫-১৫৭৮), শাহবাজ খান (১৫৮০-১৫৮৫), ওয়াজির খান (১৫৮৬-১৫৮৭) এবং রাজা মানসিংহকে (১৫৯৪-১৬০৪) তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে বাংলায় প্রেরণ করেন। তাঁরা ঈসা খান ও তাঁর মিত্রদেরকে মুগল নিয়ন্ত্রণাধীনে আনার ব্যর্থ চেষ্টা চালাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ঈসা খান সন্ধির মাধ্যমে মুগলদের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেন।

সম্রাট আকবর ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি প্রশাসনকে পুনর্বিন্যস্ত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তিনি একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করেন এবং তাঁর সাম্রাজ্যকে ১২টি (পরবর্তীকালে ১৫টি) সুবাহ-য় বিভক্ত করেন। তাঁর প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামো অনুসরণ করে। আকবরের সাম্রাজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সুবাহ ছিল বাংলা। আবুল ফজলের তথ্যানুসারে, বাংলা ১৯টি সরকারে এবং প্রত্যেকটি সরকার আবার কতগুলি পরগণায় বিভক্ত ছিল। আকবর জাবতি প্রথা নামে একটি রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এর মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে ভূমি জরিপ, শ্রেণিকরণ এবং সরকারকে একটি নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। তবে এ ব্যবস্থা বাংলায় প্রবর্তিত হয় নি এবং মুর্শিদকুলী খান এর পূর্বপর্যন্ত বাংলা সুবাহ-র রাজস্ব ব্যবস্থা একটি সুষ্ঠু রূপ পরিগ্রহ করে নি। মনসবদারি পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে আকবর তাঁর সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠিত করেন। এ ব্যবস্থাধীনে প্রত্যেক কর্মকর্তাই মনসব বা পদমর্যাদার অধিকারী ছিলেন এবং প্রত্যেককে নির্দিষ্টসংখ্যক ঘোড়া, হাতি, ভারবাহী পশু এবং শকট রাখতে হতো। নগদ অর্থ বা ভূমি অনুদানের মাধ্যমে তাদের ভাতা প্রদান করা হতো।

আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহী বাংলার জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। পন্ডিতদের মতে, আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক। আকবরের রাজত্বকালে শিল্প ও স্থাপত্যের বিশেষ অগ্রগতি সাধিত হয়। বাংলার শহরগুলির মধ্যে রাজমহল (যার নামকরণ করা হয়েছিল ‘আকবরনগর’) এবং হুগলিতে তাঁর সময়ে নির্মিত হয় বেশ কিছু সুরম্য অট্টালিকা।
[কে.এম করিম]

ওসমানী, জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি (১৯১৮-১৯৮৪) বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী এবং মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। ১৯১৮ সালের ১ নভেম্বর সুনামগঞ্জে তাঁর জন্ম। তিনি ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারি হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৩৮ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৩৯ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেন। একই সময়ে তিনি রাজকীয় সামরিক বাহিনীতে জেন্টলম্যান ক্যাডেট নির্বাচিত হন। ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগ না দিয়ে তিনি ১৯৩৯ সালের জুলাই মাসে দেরাদুনে ব্রিটিশ ভারতীয় সামরিক একাডেমী থেকে সামরিক কোর্স সম্পন্ন করে রাজকীয় বাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগ দেন (অক্টোবর ১৯৪০)। ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওসমানী মেজর পদে উন্নীত হয়ে ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি বার্মা রণাঙ্গনে ব্রিটিশ বাহিনীর অধিনায়করূপে যুদ্ধ করেন। ১৯৪৭ সালে সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসার কোর্স সম্পন্ন করার পর ওসমানী লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে নিয়োগের জন্য মনোনীত হন।

ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৭ অক্টোবর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং পরদিনই লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন। ১৯৪৮ সালে তিনি কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৯ সালে তাঁকে সেনাবাহিনীর চীফ অব দি জেনারেল স্টাফের সহকারি নিয়োগ করা হয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ওসমানী পর পর চতুর্দশ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের নবম ব্যাটালিয়নে রাইফেল কোম্পানির পরিচালক, পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের অতিরিক্ত কম্যান্ডান্ট এবং সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ অফিসার পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কর্নেল পদে উন্নীত হন। এরপর তিনি আর্মি হেডকোয়ার্টারে জেনারেল স্টাফ ও মিলিটারি অপারেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। ১৯৬৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ দশ বছর তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

আতাউল গণি ওসমানী ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে ওসমানী বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং তাঁর এ পদোন্নতি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়। ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল সেনাবাহিনীতে জেনারেল পদ বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন এবং জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ ও বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। ওসমানী ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং নতুন মন্ত্রিসভায় ডাক, তার ও টেলিফোন, যোগাযোগ, জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ ও বিমান চলাচল মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭৪ সালের মে মাসে ওসমানী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি যুগপৎ সংসদ-সদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্য পদ ত্যাগ করেন।

১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমদ তাঁকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। কিন্তু ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতার হত্যাকান্ডের অব্যবহিত পরেই তিনি পদত্যাগ করেন।

ওসমানী ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় জনতা পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৮ সালে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট মনোনীত প্রার্থীরূপে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৮১ সালে জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রার্থী হিসেবে পুনরায় তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আজীবন অকৃতদার ওসমানী ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।
[মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]

শাহজাহান (১৬২৮-৫৮) মুগল সম্রাট। তিনি জাহাঙ্গীরের উত্তরাধিকারী হিসেবে ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহজাহান ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয় খুররম। মেবার এবং আহমদনগর অভিযানে তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ পিতা জাহাঙ্গীর তাঁকে ‘শাহজাহান’ উপাধিতে ভূষিত করেন।


সম্রাট শাহজাহান
১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকার প্রশ্নে তাঁর জীবিত দুই পুত্র শাহজাহান ও শাহরিয়ারের মধ্যে এক দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়। শ্বশুর আসফ খানের কূটনৈতিক কৌশলের বদৌলতে ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে ‘আবুল মুজাফ্ফর শিহাবুদ্দীন মুহম্মদ শাহজাহান’ উপাধি নিয়ে শাহজাহান আগ্রার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি উত্তর পূর্বে আসাম ও আরাকানে রাজ্যবিস্তার নীতি অনুসরণ করেন। তিনি কাসিম খান জুইনি (১৬২৮-১৬৩২), আজম খান (১৬৩২-৩৫), ইসলাম খান মাশহাদী (১৬৩৫-১৬৩৯) এবং শাহ সুজা (১৬৩৯-১৬৬০)-কে পর পর বাংলার গভর্নর নিযুক্ত করেন। পর্তুগিজরা তাঁর সময় হুগলিতে বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের নামে বিভিন্ন প্রকার অপকর্ম চালাতে থাকে যা মুগলদের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদেরকে প্রদত্ত বিশেষ সুযোগ-সুবিধার যথেচ্ছ অপব্যবহার করে তারা স্থানীয় অধিবাসীদের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচার চালায়। অনেককে ধরে নিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করে। এমনকি তাদের ধর্মপ্রচারকগণও স্থানীয় জনগণকে বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করতে শুরু করে। ফিরিঙ্গিরা (চট্টগ্রামের পর্তুগিজ জলদস্যু) আরাকান রাজার পক্ষে মুগলদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। হুগলিতে দুর্গ নির্মাণ করে তারা নিজেদের বসতিকে সুরক্ষিত এবং বাংলার নদীগুলিতে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে অবাধে জলদস্যুতা শুরু করে। বিদ্রোহী যুবরাজ হিসেবে বাংলায় অবস্থানকালে এতদঞ্চলের পর্তুগিজ সমস্যা সম্পর্কে শাহজাহান অবগত ছিলেন। সম্রাটের নির্দেশক্রমে কাশিম খান ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজদের হুগলি থেকে বিতাড়িত করেন। এ সময় বহু সংখ্যক পর্তুগিজ প্রাণ হারায় এবং যারা বেঁচে ছিল তারা বন্দি হয়। বছর খানেক পর পর্তুগিজরা ফিরে আসার অনুমতি পেলেও এবারে তাদের শক্তি ছিল সীমিত। গভর্নর ইসলাম খান মাশহাদীর আমলে আসামের রাজা প্রতাপসিংহ মুগলদের কাছ থেকে কামরূপ পুনরুদ্ধারে পরীক্ষিৎ নারায়ণকে সহায়তা করে এক আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেন। উভয় পক্ষে বেশ কয়েকটি খন্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং অবশেষে আসামরাজ মুগলদের সঙ্গে শান্তি স্থাপনে বাধ্য হন এবং কামরূপ তাদের হাতে ছেড়ে দেন। চট্টগ্রামে অবস্থানকারী পর্তুগিজদের সহায়তায় মগ জলদস্যুরা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় লুণ্ঠন চালিয়ে এ অঞ্চলকে বিধ্বস্ত করে। ইসলাম খান মাশহাদী তাদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে তারা পালিয়ে যায়।

ইসলাম খান মাশহাদী ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং সম্রাটের দ্বিতীয় পুত্র যুবরাজ সুজা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। শাহ সুজার শাসনামলে বাংলার কৃষি ও বাণিজ্যে সমৃদ্ধি দেখা দেয় এবং দেশে শান্তি বিরাজ করে। উত্তর-পূর্ব সীমান্তের মুগল বিরোধীরা রাজকুমারের বিপক্ষে বিশৃংখলা সৃষ্টির সাহস পায় নি এবং তাঁর সময়ে মারাত্মক ধরনের কোন বিদেশী আক্রমণও সংঘটিত হয় নি। তাঁর আমলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় অবাধ বাণিজ্যিক অধিকার লাভ এবং বালাশোর, হুগলি ও পিপলিতে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। শাহ সুজার সময়ে বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর হতে রাজমহলে স্থানান্তরিত হয়। ১৬৪২ সালে উড়িষ্যাও তাঁর অধীনে ন্যস্ত করা হয়। তাঁর শাসনকালে পারস্যের ধর্মপ্রাণ শিয়া মতাবলম্বী বহু সম্ভ্রান্ত ও বিদ্বান ব্যক্তি বাংলায় আসেন।

শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে উত্তরাধিকার প্রশ্নে তাঁর চার পুত্র এক গৃহযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এদের মধ্যে সুজাই সর্বপ্রথম নিজেকে রাজমহল থেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। উত্তরাধিকারের এ লড়াইয়ে সুজা দুবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হন প্রথমবার দারা এবং দ্বিতীয়বার আওরঙ্গজেব-এর বিরুদ্ধে। বাহাদুরপুরের যুদ্ধে দারার বাহিনী কর্তৃক সুজা পরাজিত হয়ে রাজমহলে প্রত্যাবর্তন করেন। ইতোমধ্যে আওরঙ্গজেব মুরাদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কয়েকটি যুদ্ধে পরপর জয়লাভ করেন। তিনি সম্রাট শাহজাহানকে আগ্রার দুর্গে অন্তরীণ করেন, গোয়ালিয়র দুর্গে মুরাদকে অবরুদ্ধ করে নিজে দিল্লির সিংহাসন অধিকার করেন। আওরঙ্গজেবের সিংহাসনে আরোহণের পর সুজা পুনরায় তাঁর ভাগ্য পরীক্ষার চেষ্টা করলেও খাজোয়ার যুদ্ধে তিনি দারুণভাবে পরাজিত হন। রাজকীয় সৈন্যবাহিনীর ক্রমাগত চাপের মুখে সুজা আরাকানে আশ্রয় নেন এবং সেখানকার রাজার গোপন চক্রান্তে সপরিবারে নিহত হন।

তাজমহল, বিভিন্ন সৌধ, বাগান প্রভৃতি স্থাপত্যকর্মে শাহজাহানের পরিশীলিত রুচির প্রকাশ ঘটেছে। সুবিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন শাহজাহানের আমলে আড়ম্বর এবং ঐশর্যের চিত্রই তুলে ধরে। আওরঙ্গজেবের সিংহাসন আরোহণের আট বছর পর ১৬৬৬ সালে শাহজাহানের মৃত্যু হয়।
[কে.এম করিম]

আলীবর্দী খান(১৬৭৬-১৭৫৬) বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নওয়াব (১৭৪০-১৭৫৬)। তিনি প্রথম জীবনে মির্জা মুহম্মদ আলী নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত মির্জা মুহম্মদের পুত্র। মির্জা মুহম্মদ ছিলেন আওরঙ্গজেব-এর দ্বিতীয় পুত্র মির্জা আজম শাহের দরবারের একজন কর্মচারী। তার মাতা ছিলেন খোরাসানে বসবাসকারী আফসার গোত্রীয় তুর্কি এবং তার পিতামহ ছিলেন আওরঙ্গজেবের বৈমাত্রেয় ভাই। মুহম্মদ আলী বয়োপ্রাপ্ত হলে আজম শাহ তাঁকে পিলখানার (হাতিশালা) তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করেন। অচিরেই তাঁকে জার্দোজখানার (জরিদার বস্ত্রের গুদামঘর) তত্ত্বাবধায়কের পদ প্রদান করা হয়। তাঁর পৃষ্ঠপোষক আজম শাহ ১৭০৭ সালে এক যুদ্ধে নিহত হলে তিনি চাকুরিহারা হন। ফলে তাঁর পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। জীবিকা নির্বাহের জন্য ভাগ্যান্বেষণে তিনি বাংলায় যাবার সিদ্ধান্ত নেন। তৎকালীন বাংলা অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় রাজনৈতিক ঝামেলামুক্ত ছিল। ১৭২০ সালে তিনি তাঁর পরিবার পরিজন নিয়ে বাংলার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু বাংলার নওয়াব মুর্শিদকুলী খান তাঁকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেননি। ফলে তিনি কটকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। কটকের শাসনকর্তা সুজাউদ্দীন তাঁকে সসম্মানে গ্রহণ করে একশ টাকা মাসিক বেতনে চাকুরি প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিশ্বস্ততা এবং উড়িষ্যায় অবাধ্য জমিদারদের দমনে সাফল্যের জন্য তাঁকে উচ্চপদে নিয়োগ করা হয়। এভাবে উড়িষ্যা হয়ে ওঠে বাংলার ভবিষ্যত নবাব মির্জা মুহম্মদ আলীর অনুশীলনের ক্ষেত্র।


আলীবর্দী খান
সুজাউদ্দীনের শ্বশুর মুর্শিদকুলী জাফর খানের মৃত্যুর পর মির্জা মুহম্মদ আলী সুজাউদ্দীনকে বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে সক্রিয় সাহায্য করেন। মুর্শিদকুলীর কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় সুজাউদ্দীনই ছিলেন বাংলার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী। কিন্তু জামাতা এবং শ্বশুরের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল না। ১৭২৭ সালের ৩০ জুন মুর্শিদকুলীর মৃত্যুর পর সুজাউদ্দীন মির্জা মুহম্মদ আলীর চেষ্টায় বাংলার মসনদে আরোহণ করতে সমর্থ হন।

বুদ্ধিভিত্তিক পরামর্শ এবং অকৃত্রিম সেবার জন্য সুজাউদ্দীন মির্জা মুহম্মদ আলীর পরিবারকে নানাভাবে পুরস্কৃত করেন। তিনি ১৭২৮ সালে মির্জা মুহম্মদ আলীকে গুরুত্বপূর্ণ আকবরনগর (রাজমহল) চাকলার (প্রশাসনিক বিভাগ) ফৌজদার নিয়োগ করেন, এবং তাঁকে ‘আলীবর্দী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। নতুন ফৌজদার আলীবর্দী খান একজন সুশাসক প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

সকল রাষ্ট্রীয় কার্যে সুজাউদ্দীন আলীবর্দীকে উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। নওয়াব আলীবর্দীর উপদেশের ওপর সুজাউদ্দীন এতটাই নির্ভরশীল ছিলেন যে, এ সুবাহর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে তাঁর মতামত নিতে সুজাউদ্দীন আলীবর্দীকে বছরে একবার রাজমহল থেকে মুর্শিদাবাদে ডেকে পাঠাতেন। ১৭৩২ সালে যখন সম্রাট মুহম্মদ শাহ বিহারকে বাংলা সুবাহর সাথে একীভূত করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই নওয়াব সুজাউদ্দীনকেই এ একীভূত বৃহত্তর প্রদেশের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু সুজাউদ্দীন সম্পূর্ণ প্রদেশকে তাঁর একক শাসনাধীনে রাখা সমীচীন মনে করেন নি। বিহার তাঁর পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে মনে করে সুজাউদ্দীন ১৭৩৩ সালে আলীবর্দীকে বিহারের শাসনভার অর্পণ করেন। আলীবর্দীর এ দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিন পূর্বে তাঁর সর্বকনিষ্ঠ কন্যা আমিনা বেগমের (যার স্বামী ছিলেন জয়েনউদ্দীন আহমদ খান) গর্ভে সিরাজউদ্দৌলার জন্ম হয়। আলীবর্দীর কোনো পুত্র সন্তান ছিল না এবং সে কারণে এ শিশুকেই তিনি তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন এবং তাকে লালন পালন করেন। আজিমাবাদে এক বছর অবস্থানের পর সুজাউদ্দীন আলীবর্দীকে মুর্শিদাবাদে ডেকে পাঠান, তাঁকে ‘মহববত জং’ উপাধি প্রদান করেন এবং পাঁচ হাজারি মনসবদার (পদমর্যাদা) পদে উন্নীত করেন। এরপর আলীবর্দী আজিমাবাদে ফিরে যান।

কখনও কঠোর দমননীতি আবার কখনও নমনীয় নীতি গ্রহণ করে আলীবর্দী বিহারে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা আনয়ন করেন। নতুন কর আরোপ না করে শুধু জমিদারদের কাছ থেকে সঠিকভাবে বকেয়া কর আদায় করেই তিনি সরকারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি সাধন করেন। এর ফলে তিনি সুজাউদ্দীনের সুনজরে আসেন এবং নিজের অবস্থান অধিকতর মর্যাদাসম্পন্ন ও মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৭৩৯ সালের ১৩ মার্চ সুজাউদ্দীনের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র সরফরাজ বাংলার মসনদে আসীন হন। কিন্তু মাত্র এক বছর এক মাসের মধ্যেই ক্ষমতালিপ্সু বিশ্বাসঘাতক চক্রের ষড়যন্ত্রের ফলে তাঁর সরকারের পতন হয়। যে সব সরকারি কর্মকর্তা সুজাউদ্দীনের আমলে তাঁর অনুগত ছিল তাঁরাই সরফরাজের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সে সময়ে দিল্লি সাম্রাজ্যের ওপর বৈদেশিক আক্রমণ এসব ক্ষমতালিপ্সু কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের সহায়ক হয়। আলীবর্দী এবং তাঁর ভাই হাজী আহমদের জন্যও সেটা ছিল সুবর্ণ সুযোগ, কারণ তখন দিল্লির বাদশাহ মুহম্মদ শাহ নাদির শাহের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েন।

অত্যন্ত সতর্কতা ও পারদর্শিতার সঙ্গে পরিকল্পনা করে আলীবর্দী বাংলার সুবাহদারি লাভের প্রয়াস পান। ১৭৪০ সালে দিল্লির রাজদরবারে অবস্থানরত তাঁর বন্ধু মুতামানউদ্দৌলার সহযোগিতায় তিনি দিল্লির বাদশাহ মুহম্মদ শাহের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা শাসনের সনদ লাভ করেন। এ সনদ বলে তিনি সরফরাজের কাছ থেকে বাংলার শাসনাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ লাভ করেন এবং ১৭৪০ সালের ১০ এপ্রিল সংঘঠিত গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজকে পরাজিত ও নিহত করেন। সে বছর এপ্রিল মাসের শেষ দিকে তিনি বাংলার নওয়াব হিসেবে বাদশাহ মুহম্মদ শাহের স্বীকৃতি লাভ করেন। বাদশাহ তাঁকে ‘সুজাউল মুলক’ ও ‘হুসামউদ্দৌলা’ উপাধি প্রদান করেন।

গিরিয়ার যুদ্ধ আলীবর্দীকে বাংলা ও বিহারের অবিসংবাদিত নেতার মর্যাদায় উন্নীত করে। কিন্তু উড়িষ্যা তখনও তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, কারণ তখনও উড়িষ্যার ডেপুটি গভর্নর রুস্তম জং (নিহত সরফরাজের আত্মীয়) তাঁর কর্তৃত্ব স্বীকার করেন নি। কিন্তু ১৭৪১ সালের ৩ মার্চ ফুলওয়ারিয়ন নামক স্থানে এক যুদ্ধে আলীবর্দী রুস্তম জংকে পরাজিত করেন। পরে মির্জা বকরও আলীবর্দীর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে, কিন্তু যুদ্ধে আলীবর্দীর হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।

১৭৪১ সালের শেষ নাগাদ আলীবর্দী তাঁর সব শত্রুকে পরাভূত করে সমগ্র বাংলা বিহার ও উড়িষ্যায় তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠ করেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি মারাঠা আক্রমণের হুমকির সম্মুখীন হন। তাঁর এলাকায় সর্বপ্রথম মারাঠা আক্রমণ সংঘঠিত হয় ১৭৪২ সালে। তারপর ১৭৫১ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই মারাঠারা তার রাজ্য আক্রমণ করে। আলীবর্দী মারাঠাদের পরাজিত করেন এবং ১৭৫১ সালের মে অথবা জুনে নাগপুর শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করতে মারাঠাদের বাধ্য করেন। তবে মারাঠা আক্রমণে বাংলার বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি ও অন্যান্য আর্থিক ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।

মারাঠা আক্রমণ বিহারে আফগান বিদ্রোহ ত্বরান্বিত করে। আলীবর্দী এসব সমস্যা মোকাবিলার ঐকান্তিক চেষ্টা চালান। কিন্তু সার্বিকভাবে দুর্যোগ নির্মূল করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলে ইউরোপীয় বণিকরা বাংলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে আরও দুঃসাহসী হয়ে ওঠে, যেমনটি তারা করেছিল দক্ষিণ ভারতে।

এসব দুর্যোগ নওয়াবকে ভীষণভাবে বিষণ্ণ ও ভারাক্রান্ত করে তোলে এবং এতে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে থাকে। তিনি অচিরেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর মৃত্যু আসন্ন ভেবে তিনি তাঁর দৌহিত্র ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী সিরাজউদ্দৌলাকে কাছে ডেকে দেশ শাসন সম্পর্কিত কিছু মূল্যবান উপদেশ দেন। ইতোমধ্যেই নওয়াবের অসুস্থতা মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং তিনি ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল ৮০ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

আলীবর্দীর শাসন ১৬ বছর স্থায়ী হয়। প্রথম এগারো বছর তিনি বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকায় তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলে তিনি তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিতে পারেন নি। ১৭৫১ সালে মারাঠাদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তিনি যুদ্ধবিধবস্ত দেশে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড হাতে নেন। যে সব অঞ্চল মারাঠা আক্রমণে ধ্বংস হয় সেগুলি পুনর্গঠনে তিনি আত্মনিয়োগ করেন এবং কৃষকদের চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু পুনর্গঠন কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নওয়াব পরলোক গমন করেন।
[মোহাম্মদ শাহ]

একটি চাকুরির ভাইভাতে ......
যুগ্ম সচিব : তুমি জান তুমি কোন পদের জন্য ভাইভা দিতে এসেছ?
প্রার্থী : জ্বি স্যার, আমি জানি। আমি স্টোর কিপার পদের জন্য ভাইভা দিতে এসেছি।
যুগ্ম সচিব : তুমি অর্থনীতি বিষয়ের উপর স্নাতকোত্তর পাশ করেছ। রেজাল্টতো খুব ভাল। তোমাকে দেখেওতো পরিশ্রমী মনে হয়। তুমি কেন এই ৩য় শ্রেণীর জবে আসতে চাও? (একটু উচ্চস্বরে)
প্রার্থী : স্যার, স্যার! খুব শীঘ্রই আমার একটা চাকুরি দরকার, খুব দরকার। আমার বাবা পঙ্গু, মা নেই। পঙ্গু বাবার চিকিৎসা করাতে পারছি না। টিউশন চালিয়ে আর পারছি না। পাস করে অনেকদিন বসে আসি। ঢাকায় এসে কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু কোথাও হচ্ছে না। একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছি।
.
যুগ্ম সচিব : হুম, হোচট খাওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়, জয়ের অনিহা থেকেই পরাজয় শুরু হয়। তুমি আরো ভাল করে প্রস্তুতি নাও। আরো ভাল জবের জন্য, আরো ভালো কিছুর জন্য লেগে থাকো।
প্রার্থী : জ্বি স্যার, আমি চেষ্টা করছি।
যুগ্ম সচিব : তবে হচ্ছে না কেন? নিশ্চয়ই তোমার প্রস্তুতির ঘাটতি আছে, তাই না?
প্রার্থী : জ্বি স্যার।
যুগ্ম সচিব : এই দেখো, আমি তোমাকে ভাইভাতে জিরো দিলাম। জিরো মানে জিরো। এত বড় করে একটা জিরো দিলাম। এই পদে আছে শুধু কালো টাকা। এখানে একবার ঢুকলে তুমি হারিয়ে যাবে। নিজেকে আর খুঁজে পাবে না। আমি তোমাকে ফেল করিয়ে দিলাম।
প্রার্থী : স্যার, স্যার!
যুগ্ম সচিব : না, তোমাকে আমি এই জবে আসতে দিব না। আরো ভাল করে প্রস্তুতি নাও। বিসিএস, নন ক্যাডার, ব্যাংক বা অন্যান্য ভাল জবের জন্য চেষ্টা করো। আমার ভিজিটিং কার্ডটা রাখো। আর আমি মাঝে মধ্যে বেইলি রোড, অফিসার্স ক্লাব এ সময় দেই। কখনো প্রয়োজন হলে যোগাযোগ করবে। যাও, এখন তুমি যাও। (মৃদু হেসে)
প্রার্থী : জ্বি স্যার! দোয়া করবেন স্যার। (কিছুটা আবেগ তাড়িত হয়ে)
.
৭/৮ মাস পর ......
আমি (সেই প্রার্থী) সোনালি ব্যাংক এ 'সিনিয়র অফিসার' পদে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম। সামনেই ভাইভা। যুগ্ম সচিব স্যারের কথা মনে পড়লো। বার বার ভিজিটিং কার্ড এর মুঠোফোন নম্বরে কল দিলাম। কয়েক দিন চেষ্টা করলাম। স্যার কে পেলাম না। এরপর ছুটে গেলাম বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে। কিন্তু কয়েকবার গিয়েও আমি স্যারকে পেলাম না। চতুর্থবার যখন গেলাম তখন ভাগ্য ফিরে তাকালো। অবশেষে স্যার কে পেলাম!!
.
যুগ্ম সচিব : কি খবর ইয়াং ম্যান? হাউ আর ইউ?
প্রার্থী : স্যার ভাল। স্যার, আমি একটি সরকারী ব্যাংক এ 'সিনিয়র অফিসার' পদে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। আমি গত ৭-৮ টা মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। খুব সুন্দর করে নিখুঁতভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছি। সামনে আমার ভাইভা। আমার জন্য দোয়া করবেন স্যার।
যুগ্ম সচিব : হুম, ঠিক আছে। তুমি ভাল করে ভাইভা দাও। নিজ সাবজেক্ট নিয়ে ভাল করে প্রস্তুতি নিয়ে যাও। আর তোমার admit card টা আমাকে mail করে দিও। আমি বলে দিব।
প্রার্থী : অনেক অনেক ধন্যবাদ স্যার। খুশি হয়ে ফিরে এলাম।
.
(আসলে যুগ্ম সচিব স্যার কিছুই করেননি, কোন সুপারিশই করেননি! কারণ উনি জানতেন, ব্যাংক ভাইভাতে মাত্র ২০-৩০ নম্বর থাকে। প্রায় সবাইকেই একটা গড় নম্বর দেয়া হয়। লিখিত পরীক্ষা ভাল দিলে থাকলে চাকুরিটা এমনিতেই হয়ে যাবে। আমি কেন উনার কাছে ছুটে গিয়েছিলাম, সেটা উনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই আমাকে একটু সান্তনা দেয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য। উনি আমার মনটা ভাঙ্গতে চাননি।)
.
কয়েক মাস পর ......
আমি সেই সরকারী ব্যাংক এ 'সিনিয়র অফিসার' পদে নিয়োগ পেলাম। স্যারকে জানালাম। স্যার খুব খুশি হলেন। স্যার জানতে চাইলেন, আমার next প্ল্যান কি? আমি বললাম, স্যার আমি ৩৪ তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার্থী। এটা শুনে স্যার আমাকে খুব ভাল করে লিখিত পরীক্ষা দেয়ার কথা বললেন। ৩৪ তম বিসিএস (লিখিত) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলাম। লিখিত পরীক্ষায়ও পাস করলাম। আমার ঢাকার বাহিরে পোস্টিং ছিল। তাই সরাসরি স্যারের সাথে দেখা করতে পারলাম না।
.
একদিন স্যারকে ফোন দিলাম ......
প্রার্থী : স্যার, আমি ৩৪ তম বিসিএস (লিখিত) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। অচিরেই আমার ভাইভা শুরু হবে।
যুগ্ম সচিব : ভেরি গুড, ইয়াং ম্যান! শোনো, মনোযোগ দিয়ে শোনো। ভাইভাতে খুব আত্মবিশ্বাস রাখবে। এতটুকু ঘাবড়াবে না। কেউই সব জানে না, কেউই সব পারে না। বিসিএস ভাইভাতে মেধার চেয়ে প্রার্থীর overall যোগ্যতা এবং ক্যাডার পদের জন্য প্রার্থীর suitability কতটুকু - সেটা বেশি গুরুত্বের সহিত দেখা হয়। সোজা কথা, যাকে দেখে বেশ উপযুক্ত মনে হবে, তাকে জিজ্ঞাসা করবে, "বারাক ওবামা কে?" আর যাকে একেবারেই উপযুক্ত মনে হবে না, তাকে জিজ্ঞাসা করবে, "বলো, বারাক ওবামার মায়ের নাম কি?"
প্রার্থী : জ্বি স্যার। আপনার কথাগুলো মনে থাকবে স্যার।
.
সেটা ছিল - ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সাল। ৩৪ তম বিসিএস এর ভাইভা দিলাম।
বোর্ড ছিল - শরিফ এনামুল কবির স্যারের। ভাইভাটা মন্দ হলো না।
অত:পর আগস্ট, ২০১৫ সাল। ৩৪ তম বিসিএস এর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষিত হলো।
বিসিএস (কর), সহকারী কর কমিশনার পদে নিজের রোল সুপারিশকৃত দেখলাম!
.
আবেগে ভেসে গেলাম। চোখ দুটি জলে ভরে এল। আমিতো জানি, গত ৩-৪ টা বছর আমি কতটা কষ্টে দিনানিপাত করেছি। বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে কতরাত আমি নির্ঘুম কাটিয়েছি। একসময় আমার দু-চোখ শুধু আঁধারের রুপ দেখে নি:শেষ হয়ে যেত। চাকুরিতে আবেদনের টাকা টুকু ধার করতে হতো। এরপরও একের পর এক চাকুরির নিয়োগ পরীক্ষায় হেরে যেতাম। আজ আমি জয়ী। জিরো থেকে হিরো। স্টোর কিপার এর সেই ভাইভায় জিরো পেয়েছিলাম। সেই চাকুরিটা পাবার ব্যর্থতাই আজ আমার জীবনের বড় সফলতা।
.
স্যারের কথা খুব খুব মনে পড়লো।
মনটা বলে উঠলো,
'তোমার দৃষ্টিসীমায় আশ্রয় পেয়েছিল আমার জীবনের দুঃসময়। আজ আমার সুসময়, বড় সুসময়।'
.
স্যার বলেছিলেন,
'হোচট খাওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়,
জয়ের অনীহা থেকেই পরাজয়টা শুরু হয়।'
[Collected]

বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর:- (১৯৪৯-১৯৭১) সামরিক বাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের অফিসার, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার রহিমগঞ্জ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা আব্দুল মোতালেব হাওলাদার ছিলেন মরমী গানের প্রতি আসক্ত এক সংসার বিবাগী ব্যক্তিত্ব। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মুলাদির পাতারচর প্রাইমারী স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে মুলাদি মাহমুদজান পাইলট হাইস্কুল থেকে এস.এস.সি এবং ১৯৬৬ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচ.এস.সি পাশ করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে বি.এস-সি অর্নাস ক্লাশে ভর্তি হন।


বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৬৭ সালে ১৫তম শর্ট সার্ভিস কোর্সে প্রশিক্ষণার্থী অফিসার ক্যাডেট নির্বাচিত হন এবং কাকুলে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কমিশন্ড পদ লাভ করে তিনি ১৭৩ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে যোগ দেন। তিনি ১৯৬৮ সালের ৩ ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৬৯-৭০ সালে রিসালপুরে মিলিটারি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে বেসিক কোর্স ট্রেনিং এবং পরে ইনফ্যান্ট্রি স্কুল অব ট্যাক্টিক্র্ থেকে অফিসার উইপন ও ডব্লিউ কোর্স-১৩ সমাপ্ত করেন। ১৯৭০ সালের ৩০ আগষ্ট তিনি ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সোয়াতের সাইদুর শরীফে ১৭৩ নম্বর ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে তিনি তাঁর তিনজন সহকর্মি ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার ও ক্যাপ্টেন আনাম সহ গোপনে ৩ জুলাই কর্মস্থল ত্যাগ করেন এবং দুর্গম পার্বত্য এলাকা ও মুনাওয়ার তায়ী নদী অতিক্রম করে শিয়ালকোটের নিকটে সীমান্ত পার হন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে ৭ নং সেক্টরের মেহেদিপুর (মালদহ জেলায়) সাবসেক্টরের কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। এসময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান ৭ নং সেক্টরের সেক্টর-কমান্ডার ছিলেন। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কানসাট, আরগরার হাট ও শাহপুর সহ কয়েকটি সফল অভিযানে অসাধারণ নৈপুণ্য ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। ফলে ডিসেম্বর মাসে রাজশাহীর চাঁপাইনববগঞ্জ দখলের জন্য তাঁকে একটি মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতৃত্ব দেয়া হয়।

পাকবাহিনী ইতোমধ্যেই নবাবগঞ্জ শহর প্রতিরক্ষার জন্য মহানন্দা নদীর তীরে তিন কিলোমিটার এলাকা ব্যাপি বাঙ্কার নির্মাণ করে রাখে। এ বাঙ্কারে ছিল পাঁচ ফুট গভীর গতায়াত পরিখা। লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম, লেফটেন্যান্ট আউয়াল এবং জন পঞ্চাশেক মুক্তিযোদ্ধাসহ মহিউদ্দিন নওয়াবগঞ্জ শহরের পশ্চিমে বারঘরিয়া নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন (১০ ডিসেম্বর)। ১৩ ডিসেম্বর প্রত্যূষে তিনি এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা সহ রেহাইচরের মধ্য দিয়ে নৌকাযোগে মহানন্দা নদী পার হন এবং অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে শত্রুর বেশ কয়েকটি বাঙ্কার দখল করে নেন। পাকিস্তানী বাহিনী তখন পশ্চাদপসরণ করে নওয়াবগঞ্জ শহরে অবস্থান নেয় এবং একটি দালানের ছাদ থেকে মেশিনগানে অনবরত গুলি চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের শহরাভিমুখে অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখে। এই সংকটময় সময়ে মহিউদ্দিন শত্রুর মেশিনগান ধ্বংস করার পরিকল্পনা নেন। তিনি বা হাতে এসএমজি ও ডান হাতে একটি গ্রেনেড নিয়ে গোপনে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসেন। হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তা পার হয়ে তিনি দ্রুত মেশিনগানবাহী বাড়িটির দিকে ধাবিত হন। ত্বরিত গতিতে তিনি মেশিনগান বরাবর গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। বিস্ফোরিত গেনেডের আঘাতে মেশিনগানের স্থলটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। অকস্মাৎ রাস্তার পাশের একটি দোতলা বাড়ি থেকে শত্রুর একটি গুলি তাঁর কপালে বিদ্ধ হয়, এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন (১৪ ডিসেম্বর)।

এতে হতোদ্যম না হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সন্ধ্যার দিকে শত্রুর অবস্থানের ওপর প্রচন্ড আক্রমণ চালায়। গভীর রাত পর্যন্ত এ আক্রমণ অব্যাহত ছিল। পাকসেনারা শেষপর্যন্ত রাতের অন্ধকারে নওয়াবগঞ্জ শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ভোর রাতে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের মৃতদেহ উদ্ধার করে তাঁকে ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকা ও আত্মদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানসূচক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা এখনও তাঁর স্মৃতি বহন করছে। এগুলো হলো বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কলেজ (বর্তমান স্বরূপনগরে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর গেট (ঢাকা সেনানিবাস), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর হাইস্কুল (রহিমগঞ্জ), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সরণি (রাজশাহীর একটি সড়ক), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ফেরি (বিআইডব্লিউটিসি), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ক্লাব (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)। [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]

বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন,
(১৯৩৫-১৯৭১) ১৯৩৫ সালের জুন মাসে ফেনী জেলার বেগমগঞ্জ থানার বাঘচাপড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা মোহাম্মদ আজহার পাটোয়ারি এবং মাতা জোলেখা খাতুন। ছোটবেলায় তাঁর পড়াশোনা শুরু হয় পাড়ার মক্তবে, পরে বাঘচাপড়া প্রাইমারি স্কুল এবং আমিষা পাড়া হাইস্কুলে। ১৯৫৩ সালে তিনি নৌবাহিনীতে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণের জন্য করাচির অদূরে মানোরা দ্বীপে পিএনএস কারসাজ-এ (নৌবাহিনীর কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে তিনি পেশাগত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন এবং ১৯৬৫ সালে মেকানিক্যাল কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। সফলভাবে কোর্স সমাপ্তির পর তিনি ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে তিনি চট্রগ্রামে পিএনএস বখতিয়ার নৌঘাঁটিতে বদলি হন।

বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রুহুল আমিন মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন এবং এপ্রিল মাসে ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে ২নং সেক্টরে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে সকল সেক্টর থেকে প্রাক্তন নৌ-সেনাদের আগরতলায় সংগঠিত করে নৌবাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো গঠন করা হয়। পরে তাদের কলকাতায় আনা হয়। সেখানে সবার সাথে রুহুল আমিনও ছিলেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে দুটি টাগবোট উপহার দেয়। এগুলোকে কলকাতার গার্ডেন রীচ নৌ-ওয়ার্কশপে দুটি বাফার গান ও মাইন-পড জুড়ে গানবোটে রূপান্তর করা হয়। গানবোট দুটির নামকরণ হয় ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’। রুহুল আমিন নিয়োগ পান পলাশের ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার হিসেবে।
৬ ডিসেম্বর মংলা বন্দরে পাকিস্তানি নৌঘাটি পিএনএস তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে ‘পদ্মা’, ‘পলাশ’ ও মিত্র বাহিনীর গানবোট ‘পানভেল’ ভারতের হলদিয়া নৌঘাঁটি থেকে রওনা হয়। ৮ ডিসেম্বর সুন্দরবনের আড়াই বানকিতে বিএসএফের পেট্রোল ক্রাফট ‘চিত্রাঙ্গদা’ তাদের বহরে যোগ দেয়। ৯ ডিসেম্বর কোনো বাধা ছাড়াই তারা হিরণ পয়েন্টে প্রবেশ করেন।
পরদিন ১০ ডিসেম্বর ভোর ৪টায় তারা মংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সকাল ৭টায় কোনো বাধা ছাড়াই তারা মংলায় পৌঁছান। পেট্রোল ক্রাফট চিত্রাঙ্গদা মংলাতেই অবস্থান নেয় এবং পানভেল, পদ্মা ও পলাশ সামনে অগ্রসর হতে থাকে। দুপুর ১২টায় তারা খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি পৌঁছান। এসময় আকাশে তিনটি জঙ্গি বিমান দেখা যায়। পদ্মা ও পলাশ থেকে বিমানের উপর গুলিবর্ষণ করার অনুমতি চাইলে বহরের কমান্ডার বিমানগুলো ভারতীয় বলে জানান। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে বিমানগুলি পদ্মা ও পলাশের ওপর গুলি ও বোমা বর্ষণ শুরু করে। পলাশের কমান্ডার সবাইকে গানবোট ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু রুহুল আমিন পলাশেই অবস্থান নেন এবং আপ্রাণ চেষ্টা চালান গানবোটকে সচল রাখতে। হঠাৎ শত্রুর একটি গোলা পলাশের ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে এবং তা ধ্বংস হয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে রুহুল আমিন নদীতে লাফিয়ে পড়েন এবং আহত অবস্থায় কোনক্রমে তীরে উঠতে সক্ষম হন। দুর্ভাগ্যক্রমে তীরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাঁর লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি।
মুক্তিযুদ্ধে রুহুল আমিনের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে।
[কাজী সাজ্জাদ আলী জহির]
সুত্রঃ বাংলাপিডিয়া।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ (১৯৩৬-১৯৭১) পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ল্যান্স নায়েক, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। নূর মোহাম্মদ শেখ নড়াইল জেলার মহিষখালি গ্রামে ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পিতৃমাতৃহীন অবস্থায় আর্থিক সংকটের ফলে তিনি পৈতৃক জমিজমা বিক্রি করে ফেলেন। পরে তিনি স্থানীয় আনসার বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ তিনি পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্-এ যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁর পোস্টিং হয় দিনাজপুর সেক্টরে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি দিনাজপুর সেক্টরে যুদ্ধে আহত হন। যুদ্ধে তাঁর বীরত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ সরকার তাঁকে ‘তমগা-এ-জং’ ও ‘সিতারা-এ-হরব’ পদকে ভূষিত করে। ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে তিনি যশোর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে বদলি হন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে গ্রামের বাড়িতে ছুটি কাটাতে এসে নূর মোহাম্মদ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি যশোর ৮ নং সেক্টরে যুদ্ধরত ছিলেন। একটি স্থায়ী টহল-দলের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনকালে ৫ সেপ্টেম্বর পাকসেনারা মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা ঘাঁটির তিন দিকে অবস্থান নেয় এবং অতর্কিতে টহল-দলটিকে ঘিরে ফেলে। নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে টহল-দলটি পাকসেনাদের আক্রমণ প্রতিহত করে। এই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে সীমান্তবর্তী কাশীপুরে সমাহিত করে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে।
​[মোঃ সিদ্দিকুর রহমান]

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ, (১৯৪৩-১৯৭১) পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ল্যান্স নায়েক, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৪৩ সালের ৮ মে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী থানার সালামতপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা মুন্সী মেহেদী হাসান ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম। মাতা মকিদুন্নেসা। আবদুর রউফ গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করেন। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন। সংসারের অভাব দেখে আবদুর রউফ ১৯৬৩ সালের ৮ মে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল্সে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে নিয়োগ পান পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আবদুর রউফ ইপিআর-এর ১১নং উইং চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা সারা দেশে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। চট্টগ্রাম ইপিআর-এর বাঙালি সদস্যদের পূর্ব সচেতনতা এবং সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে তারা রুখে দাঁড়ায় শত্রুর বিরুদ্ধে। রাতেই তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। যোগ দেয় ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাথে।

ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআর-এর ১৫০ জন সৈনিককে দায়িত্ব দেওয়া হয় রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি নৌপথে নিরাপত্তাব্যুহ তৈরির। এই দলের এক নম্বর এলএমজি চালক মুন্সী আবদুর রউফ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নানিয়ারচর উপজেলাধীন বাকছড়ির একটি বাঙ্কারে।
৮ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২ নং কমান্ডো ব্যাটেলিয়ানের দুই কোম্পানি সৈনিক ৭টি স্পিডবোট ও ২টি লঞ্চ সহযোগে রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি নৌপথের আশেপাশে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীর অবস্থান অাঁচ করে লঞ্চ থেকে তাদের অবস্থানের উপর মর্টারে গোলাবর্ষণ শুরু করে। তাদের এই অতর্কিত আক্রমণে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এই সুযোগে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য তীরে নেমে মুক্তিবাহিনীর অবস্থান ঘিরে ফেলে।#
ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান পেছনে হটার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু নিরাপদে অবস্থান ত্যাগের জন্য প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন কাভারিং ফায়ার। মুন্সী আবদুর রউফের এলএমজির কাভারিং ফায়ারে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান তাঁর সৈন্যদের নিয়ে পেছনে হটতে থাকেন। তাঁর অব্যর্থ গুলিতে স্পিডবোটগুলো ডুবে যায় এবং সেগুলোতে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা হতাহত হয়। বাকি সৈন্যরা লঞ্চ দুটিতে করে পালাতে থাকে। পাকিস্তানি সৈন্যরা এলএমজির রেঞ্জের বাইরে গিয়ে লঞ্চ থেকে মর্টারে গোলা বর্ষণ করতে থাকে। অসম সাহসী আবদুর রউফ তখনো গুলি চালানো অব্যাহত রেখেছিলেন। অকস্মাৎ শত্রুর একটি গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় মুন্সী আবদুর রউফের দেহ। সহযোদ্ধারা পরে তাঁর লাশ উদ্ধার করে নানিয়ারচরের চিংড়ি খাল সংলগ্ন একটি টিলার উপর সমাহিত করে।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্ব ও আত্মদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে। বাংলাদেশ রাইফেলস ১৯৭৩ সালে সিপাহী মুন্সী আবদুর রউফকে অনরারি ল্যান্স নায়েক পদে মরনোত্তর পদোন্নতি দান করে।

collected from: banglapedia

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি

১. বাংলাদেশে ফোরজি চালু হয় কবে?
= ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮.

২. LTE' পূর্ণরুপ কী?
= Long- Term Evolution.

৩. বাংলাদেশে মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (MNP) সেবা চালু করবে কোন কোম্পানি?
= Infozillion BD-Teletech.

৪. শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক কোথায়?
= বেজপাড়া, যশোর।

৫. শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক কবে উদ্বোধন করা হয়?
=১০ ডিসেম্বর ২০১৭.

৬. বাংলাদেশে তৈরি প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট - এর নাম কি?
= ব্র‍্যাক অন্বেষা।

৭. বাংলাদেশে তৈরি প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট মহাকাশে উতক্ষেপণ করা হয় কবে?
= ৪ জুন ২০১৭

৮. বাংলাদেশের প্রথম স্বীকৃত কান্ট্রি কোড টপ লেভেলে ডোমেইন হলো-
=ডট বিডি

৯. বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বীকৃত কান্ট্রি কোড টপ লেভেলে ডোমেইন হলো-
=ডট বাংলা

১০. বাংলাদেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং ষ্টেশন কোথায়?
= কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)

বেকারত্ব কমাতে নতুন উদ্যোক্তা:

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। দেশের ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বেকার প্রায় ২৫ লাখ। এ সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। বলতে গেলে বেকারত্বের হার বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। প্রতি বছর গড়ে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বিএ, এমএ পাস করে বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন। এ জন্য দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে দায়ী। আজ আমাদের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ এখন টেকসই উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এ বিপুলসংখ্যক যুবক বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে কতটুকু টেকসই উন্নয়নের ভূমিকা পালন করবে তা এটি বড় প্রশ্ন। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা আর প্রতিকূলতা। আলোচ্য কলামে টেকসই উন্নয়ন ও নতুন উদ্যোক্তার প্রতিবন্ধকতাগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করা হবে।

প্রথমত, নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুঁজি থাকে না। পুঁজি সংগ্রহ করতে গিয়ে নতুন উদ্যোক্তারা পেরেশান হয়ে যান। আমাদের ব্যাংকগুলোও সৃষ্টিশীল কোনো কাজে অর্থায়ন বা ঋণ দিতে উৎসাহী নয়। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া নবীন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি কঠিন কাজ।

দ্বিতীয়ত, আমাদের সামষ্টিক একটি সমস্যা হলো। কেউ ভালো কিছুর উদ্যোগ নিলে আমরা তা মেনে নিতে পারি না। নতুন উদ্যোক্তাদের এটি একটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা। সমাজে কাউকে সৃষ্টিশীল কাজে ইতিবাচক পরামর্শ দেয়ার নজির খুব কম। কোনো কাজ শুরুর আগে আদাজল খেয়ে তার সমালোচনা আর নেতিবাচক মন্তব্য করতে আমরা খুব ভালোবাসি। নেতিবাচক মন্তব্য উৎসাহী বেশির ভাগ উদ্যোক্তাকে নিরুৎসাহিত করে। এভাবে শুরুতেই একজন নতুন উদ্যোক্তা হতাশ হয়ে পড়েন। অথচ ওই নতুন উদ্যোক্তার গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানে শতাধিক বেকারের কর্মসংস্থান হতে পারত। আমাদের নেতিবাচক মন্তব্যে গোড়াতেই তা ভণ্ডুল হয়ে যায়।

তৃতীয়ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অসহযোগিতা। আমাদের দেশে যখন কোনো নতুন কাজের উপায় উদ্ভাবন করা হয়; তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ে।
চতুর্থত, সব পেশাকে সমান চোখে না দেখা। আমরা মুখে যতই বুলি কপচাই না কেন, প্রতিটি কাজকে এখনো শ্রদ্ধার চোখে অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। এটি আমাদের একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত সম্যা। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন, উচ্চশিক্ষিত সবাইকে বড় চাকরি করতে হবে। নইলে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা মূল্যহীন।

পঞ্চমত, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতি। কেউ ব্যতিক্রমী কিছু করবে তা অকল্পনীয়।
ষষ্ঠত, ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতার অভাব। অনেকে বড় কিছু হতে চান। কিন্তু ঝুঁঁকি নিতে সাহস রাখেন না। অথচ আমাদের সবার জানা, ব্যতিক্রমী কিছু করতে ঝুঁঁকি নিতে হবে। আমরা কি কখনো এ রকম ভেবে দেখছি কেউ চাইলে বেকারত্ব ঘোচাতে পারেন। হতে পারে তা কুটির শিল্পের ছোট্ট একটি দোকান কিংবা শোপিসের শোরুম। যারা একটু তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে ভালোবাসেন; তারা দিতে পারতেন কম্পিউটার বা মোবাইলের দোকান কিংবা সার্ভিসিং সেন্টার। সৃজনশীল যারা আছেন, তারা ফ্যাশন হাউজ বা তৈরী পোশাকের দোকান। অনেকের প্রিয় খাবার চটপটি ফুচকা। এর দোকান দিয়ে কেউ বেকারত্ব অনায়াসে ঘোচাতে পারেন। অথবা ফাস্টফুডের দোকান দেয়া যেতে পারে। এসব ব্যবসায় খুলতে তেমন পুঁজির দরকার পড়ে না। আর গ্রামের কেই শুরু করতে পারেন নিজের জমিতে সবজি কিংবা ফুলের চাষ। এ ক্ষেত্রে নিজের জায়গা না থাকলে অন্যের জমি লিজ নেয়া যেতে পারে। করা যেতে পারে মজা-পচা পুকুর পরিষ্কার করে মাছ চাষ। পাশের বাজারে বা হাটে ফসল কেনাবেচার ব্যবসায় করা যেতে পারে। উন্নত প্রযুক্তির সেবা কৃষকদের সরবরাহ করেও হওয়া যেতে পারে সফল ব্যবসায়ী। যা তরুণদের দিতে পারে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি। হতে পারেন যে কেউ সফল উদ্যোক্তা।
একটি দেশের মোট জনসংখ্যার বিরাট একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হলে সে জাতির পক্ষে কী উন্নয়নের চরম শিখরে যাওয়া সম্ভব? দেশে যদি ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে বেকারত্ব ঘোচানো না যায়, তা হলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির শক্ত পাটাতন হবে না। তাই টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে চাই ছোট ছোট নতুন উদ্যোগ নিতে হবে।

[Collected]

শুভ সকাল
আজ সোমবার
৩০ সফর ১৪৪১ হিজরী
৩০ অক্টোবর ২০১৯ ইংরেজি
১৪ কার্তিক ১৪২৬ বাংলা।।।

সত্য, সহজ, সুন্দর ও সুখময় হোক সকলের পথচলা।

#বিদ্যুৎ_শক_খেলে_কি_করবেন...?

১। যদি রোগী বিদ্যুতের তারে লেগে থাকে,
তবে ভারী সেন্ডেল পায়ে পরা অবস্থায় শুকনা বাঁশ বা কাঠ দিয়ে তার টা সরিয়ে দিন।
বিদ্যুতায়িত অবস্থায় সরাসরি তাকে ধরতে যাবেন না কখনোই। নইলে আপনিও মারাত্মক বিপদে পড়বেন।

২। দ্রুত তাকে বালিশ ছাড়া, মাটিতে শুইয়ে দিন। এতে অতিরিক্ত static বিদ্যুৎ রোগীর শরীর থেকে মাটিতে (গ্রাউন্ড) চলে যাবে।

৩। মুখ, নাকে কোন ময়লা, থু থু আছে কিনা বা জিহ্বা উলটে গিয়েছে কিনা দেখে নিন। থাকলে হাতের কাছে যাই পান (কাপড়) দিয়ে পরিস্কার করে দিন, জিহ্বা উল্টে থাকলে মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে তা সোজা করে দিন।
এরপর হাত দিয়ে চোয়াল নিচে নামিয়ে মুখ খোলা অবস্থায় মুখ দিয়ে ফু দিয়ে বাতাস দিতে থাকুন। Artificial breathing (mouth to mouth) যাকে বলে।

৪। একই সাথে বুকের মাঝখানে (যেখানে হার্ট থাকে) হাতের তালুর গোড়ালি দিয়ে , ডান হাতের উপর বাম হাত রেখে ১-২-৩.... ১-২-৩ এভাবে চাপ দিতে থাকুন।( if heart beat absent )

৫। ৩ ও ৪ পদ্ধতি ৫/৭ মিনিটের মত করে পালস, হার্ট সাউন্ড (যদি সম্ভব হয়), শ্বাস প্রশ্বাস দেখুন। যদি রোগী ফিরে আসে (বেঁচে যায়) তবে বন্ধ করুন। আর ফিরে না এলে আবার ৩, ৪ রিপিট
করুন।
এর মাঝে ambulance & doctor কে call করুন as early as possible.

৬। হাত, পা, শরীর হালকা মাসাজ করে দিতে পারেন।

৭। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে "Hartsol Saline 1000 ml" ২৫/৩০ ফোটা প্রতি মিনিটে দিতে পারেন। খেতে পারলে পানি, খাবার স্যালাইন, দুধ,
ডাবের পানি এসব দিন।

♥সচেতোন হোন,নিরাপদ থাকুন,সুস্থ্ থাকুন♥

জ্বর-ঠোসা কেন হয় এবং জ্বর-ঠোসা হলে কি করবেন।।।।।।।।।।।
👆জ্বর-ঠোসা এমন একটি সমস্যা যেটি অধিকাংশ সময় ঘুম থেকে ওঠার পর ঠোটের কোনায় দৃশ্যমান হয়।যে কারনে,মনে করা হয় যে,রাতে বোধ হয় জ্বর এসেছিল।মূলত,জ্বর-ঠোসা বা কোল্ড সোর যে জ্বর আসলেই যে হবে এমন কোন কথা নেই।
👆জ্বর-ঠোসা যার ইংরেজিতে নাম,ফিভার বিলিস্টার বা কোল্ড সোর,”হার্পিস সিমপ্লেক্সে ভাইরাস টাইপ-১” দ্বারা সংঘটিত হয়।অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ভাইরাসটি আমাদের শৈশব কালীন সময়েই শরীরে প্রবেশ করে এবং বাহ্যিক ভাবে প্রকাশ পাবার আগ পর্যন্ত শরীরে ইনঅ্যাক্টিভ থাকে।
👆মনে রাখতে হবে,”হার্পিস সিমপ্লেক্সে ভাইরাস টাইপ-১” দ্বারা এক বার আক্রান্ত হলে যে জ্বর-ঠোসা, হয় তা কিন্তু সারা জীবনে পুরোপুরি ভাল হয়না।মাঝে মাঝেই এটি ফিরে এসে।বাকি সময় সুপ্ত অবস্থায় থাকে।
👆জ্বর-ঠোসা হলে তেমন কোন মেডিসিন খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।তবে,যদি ব্যথা খুব বেশি হয় তবে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।
👆গবেষণায় দেখা গেছে যে,অ্যামিনো এসিড এল-লাইসিন সমৃদ্ধ খাবার যেমনঃটক দই,চীজ,মাছ জ্বর-ঠোসার ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে।পাশাপাশি,পুষ্টিকর খাবার বিশেষ করে অ্যালকালাইন বা ক্ষারীয় খাবার যেমনঃলেবু, কমলা, পিপার, অ্যাস্পারাগাস,পার্সলি জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।
👆পাশাপাশি,আর্জিনিন সমৃদ্ধ খাবার যেমনঃ বাদাম,বীচি জাতীয় খাবার এবং চকোলেট,এসিডিক ফুড বিয়ার,বীফ এবং চিনি বাদ দেয়া উচিত।
👆হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস অতি মাত্রায় সংক্রামক।যা খুব সহজে এক জন থেকে অপর জনের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।তবে,যার মাঝে সংক্রমিত হয়,ইমিউনিটি ভাল থাকলে অধিকাংশ সময়ে তার দেহে এটি ইনঅ্যাক্টিভ থাকে।
👆জ্বর-ঠোসা,ফিভার বিলিস্টার বা কোল্ড সোর যে নামেই ডাকা হোক না কেন ব্যাপারটি বেশ যন্ত্রনা দায়ক এবং বিব্রতকর।যা,৭-১০ দিনের মধ্যে কোন রকম চিকিৎসা ছাড়াই ভাল হয়ে যায়।
👆তবে,এই কোল্ড সোর যদি ৭-১০ দিনের মধ্যে ভাল না হয় অথবা পুনরায় হয় এবং আগের চাইতে বেশি জায়গাতে হয় তবে অবশ্যয় একজন জিপি ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
👆আক্রান্ত স্থান কোন ভাবেই হাত লাগানো উচিত নয়।তবে,লিপ বাম বা মলম লাগানোর সময় পরিষ্কার হাত দিয়ে আলতো করে লাগানো উচিত।মলম বা লিপ বাম লাগানো শেষ হলে হাত ভাল ভাবে সাবান এবং কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা উচিত।
👆এই জ্বর-ঠোসা হলে নিজের প্লেট,গ্লাস,চামচ আলাদা ভাবে ব্যবহার করা উচিত।অন্য কারো গ্লাস বা প্লেট ব্যবহার করা উচিত নয়।
👆কোল্ড সোরে আক্রান্ত ব্যক্তির উচিত নিজের তোয়ালে,লিপিস্টিক,ছুরি কাঁচি অন্যের সাথে শেয়ার না করা।
👆ক্ষত স্থানে হাত দেবার পর,খেয়াল রাখতে হবে এই অপরিষ্কার হাত যেন শরীরের অন্য কোথাও না লাগে।বিশেষ করে চোখ এবং জেনিট্যাল এরিয়াতে।
👆জ্বর-ঠোসায় আক্ক্রাত হওয়া অবস্থায় কোন ছোট শিশুকে আদর করে চুমু দেয়া উচিত নয়। কারন,চুমু দেয়ার ফলে শিশুর শরীরে এই হার্পিস সিমপ্লেক্সে ভাইরাস ১ সংক্রমিত হয়।
👆অন্যান্য যে কারনেগুলোকে কোল্ড সোর হতে পারে সেগুলো হল,শরীরে অন্য কোন ধরণের ইনফেকশন যেমনঃরেসপাইরেটরি ইনফেকশন,অধিক জ্বর, ইমোশনাল আপসেট,সাইকোলজিক্যাল স্ট্রেসের কারণে,সান লাইটের কারণে,পিরিয়ডের সময়,কোন ইনজুরি বা হরমোনাল ইম্ব্যালান্সের কারণে।সুতরাং,শুধু যে জ্বর হলেই কোল্ড সোর হবে এমন নয়।
লেখক:আছিয়া পারভীন আলী শম্পা
পুষ্টিবিদ, বেক্সিমকো ফার্মা লিমিটেড।

#স্ট্রোক সাধারণত বাথরুমেই বেশি হয়ে থাকে কেন?

স্ট্রোক সাধারণত বাথরুমেই বেশি হয়ে থাকে কারন,বাথরুমে ঢুকে গোসল করার সময় আমরা প্রথমেই মাথা এবং চুল ভেজাই যা একদম উচিৎ নয়। এটি একটি ভুল পদ্ধতি।

এইভাবে প্রথমেই মাথায় পানি দিলে রক্ত দ্রুত মাথায় উঠে যায় এবং কৈশিক ও ধমনী একসাথে ছিঁড়ে যেতে পারে। ফলস্বরূপ ঘটে স্ট্রোক অতঃপর মাটিতে পড়ে যাওয়া.

কানাডার মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ট্রোক বা মিনি স্ট্রোকের কারণে যে ধরনের ঝুঁকির কথা আগে ধারণা করা হতো, প্রকৃতপক্ষে এই ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী এবং আরও ভয়াবহ।

বিশ্বের একাধিক গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, গোসলের সময় স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। চিকিৎসকদের মতে, গোসল করার সময় কিছু নিয়ম মেনে গোসল করা উচিত।

সঠিক নিয়ম মেনে গোসল না করলে হতে পারে মৃত্যুও। গোসল করার সময় প্রথমেই মাথা এবং চুল ভেজানো একদম উচিৎ নয়। কারণ, মানুষের শরীরে রক্ত সঞ্চালন একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় হয়ে থাকে। শরীরের তাপমাত্রা বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগে। চিকিৎসকদের মতে, মাথায় প্রথমেই পানি দিলে সঙ্গে সঙ্গে রক্ত সঞ্চালনের গতি বহু গুণ বেড়ে যায়। সেসময় বেড়ে যেতে পারে স্ট্রোকের ঝুঁকিও।

তা ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত রক্তচাপের ফলে মস্তিষ্কের ধমনী ছিঁড়ে যেতে পারে।
#গোসলের সঠিক নিয়মঃ-

প্রথমে পায়ের পাতা ভেজাতে হবে। এরপর আস্তে আস্তে উপর দিকে কাঁধ পর্যন্ত ভেজাতে হবে। তারপর মুখে পানি দিতে হবে। সবার শেষে মাথায় পানি দেওয়া উচিত।

এই পদ্ধতি যাদের উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং মাইগ্রেন আছে তাদের অবশ্যই পালন করা উচিৎ।

এই তথ্যগুলো বয়স্ক মা-বাবা এবং আত্মীয় পরিজনদের অবশ্যই জানিয়ে রাখুন। ❤️
ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।
[Collected]

10-Dec-2019 তারিখের কুইজ
(অংশগ্রহণ করেছেন: 815 জন)
প্রশ্নঃ ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ ভুটান ও ভারত পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দান করে। যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ‘রিচার্ড নিক্সন’। তখন ‘রিচার্ড নিক্সন’ কোন দেশকে সমর্থন প্রদান করেন?
(A) নিরপেক্ষ ছিলেন
(B) বাংলাদেশকে সমর্থন করেছিলেন
(C) পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিলেন